কবি আকমাল

 সহজ জীবনের কাছে বারবার ফিরে যান কবি। ফিরে গিয়ে খোঁজার চেষ্টা করেন জটিল জীবনের গূঢ় তত্ত্বগুলি। বোঝার চেষ্টা করেন মানব জীবন আসলে কী? এবং কেন? সমাজ সাধারণের মাঝে উপস্থিত জটিল সমীকরণগুলির সহজ সমাধান খোঁজারও চেষ্টা করে কবি মন। আত্ম আবিষ্কারে মোশগুল কবিমন বোঝার চেষ্টা করেন, জীবনের বাইরে যে আর এক জীবন, ভাবনার জীবন, মননের জীবন, আত্ম-আবিষ্কারের জীবন, সে জীবন অনেক উন্নত, সে যাপন অনেক সহজ, নির্ভেজাল ও ত্রুটি মুক্ত।





কবি মুহাম্মদ আকমাল হোসেন সেই নির্ভেজাল যাপন যাত্রার একনিষ্ঠ যাত্রীক। মনন ও মেধাকে সম্বল করে সন্তর্পণে পা ফেলে এগিয়ে চলেছেন তিনি। শুধু যাত্রা পথে কুড়িয়ে নিচ্ছেন আত্ম মন্থনের রসদ।

মা রাবিয়া বিবি, বাবা মুহাম্মদ বেলাল হোসেনের সুযোগ্য সন্তান আকমালের জন্ম ১৯৮১ সালের দোসরা (২) জানুয়ারি মালদা জেলার সুজাপুরের ব্রমত্তর গ্রামে।

আমের গ্রাম, রেশমের গ্রাম সুজাপুরে আধ্যাত্মিক ও সাহিত্য চর্চার পরিবেশ ছিল বরাবরের মত। মক্তবে, মসজিদে যেমন চলতো ধর্ম শিক্ষার জোর, তেমনই গ্রামে বসত গায়েন গানের আসর। কথার পিঠে কথা চাপিয়ে, সুরের উপর সুর আরোপ করে বানানো হত গান। সেই গানে থাকত জীবনের কথা, সহজ যাপনের কথা, রোগ, রাগ ও অনুরাগের কথা। সেই গানের রেশ ধরেই আমের গ্রাম, রেশম চাষের গ্রাম সুজাপুরে ছিল সাহিত্য চর্চার পরিবেশ।

কবি আকমাল মনে করেন তাঁর গ্রামের সাহিত্য চর্চার পরিবেশই তাকে সাহায্য করে ভাষার জটিল ব্যাকরণ পেরিয়ে শব্দ সাধনার কাছাকাছি পৌঁছাতে। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়াকালীন “অন্বেষা” নামক স্কুল ম্যাগাজিনে জমা দেন তাঁর প্রথম লেখা কবিতা। সৌভাগ্যবশত তার লেখা ছাপা হয়নি সেই পত্রিকায়।

সৌভাগ্য এই জন্যই যে, সেই পত্রিকায় সেই সময় যে সমস্ত লেখক লেখিকাদের লেখা ছাপা হয়েছিল তাদের মধ্যে কেউ এখনো লেখালেখির মধ্যে আছেন কিনা জানা নেই, তবে কবি আকমাল প্রাথমিক ব্যর্থতার পরও লিখে চলেছেন অবিরত। ধারাবাহিক ভাবে লেখালেখির সাথে যুক্ত থাকার জন্য সফলতাও অর্জন করেছেন তিনি।

১৯৯৮ সালে একাদশ শ্রেণিতে কবি আকমাল যখন পড়তেন, তখনই প্রকাশিত হয় তার প্রথম কবিতা। মসিমপুর থেকে প্রকাশিত “প্রিয় কথা” পত্রিকায়। এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন মসিমপুরের স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব আনোয়ারুল হক ও সহ সম্পাদক গল্পকার জিকরাউল হক।

শব্দের পর শব্দ ঢেলে কবিতা বাঁধেন শব্দ কারিকর। কবি আকমাল এ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র একজন তাঁত শিল্পী নন, যিনি সুতার পরে সুতো দিয়ে একটি গামছা বুনছেন। বরং তিনি তাঁর দক্ষ শব্দ ব্যবহারে হয়ে ওঠেন একজন নিখুঁত ভাস্কর। কবি আকমালের মনে হচ্ছে এ শব্দটির ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। ব্যাস, আপন দক্ষতায় ছেনি(হাতুড়ি) ঠুকে ঝরিয়ে দিচ্ছেন অপ্রয়োজনীয় শব্দের মেদ বাহুল্য। আর তার পরিবর্তে ছেঁকে ছেঁকে বসিয়ে দিচ্ছেন যথা প্রয়োজনীয় শব্দরাজী।

সহজ শব্দে বাঁচেন কবি মুহা. আকমাল হোসেন। গ্রামীন ইমেজ আর প্রান্তিক জীবন বোধের গাছ আঁকেন তিনি তার কবিতায়।  সেই গাছ ডালপালা ছড়িয়ে ছায়া করে রাখে তার কবিতাকে। কবিতা লিখছেন তিন দশক ধরে। সময় আর আত্ম উপলব্ধির ঢেউ বারবার ভেঙে দিয়ে যায় তার নিজস্ব লেখার ছক। শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়ে থাকেন তিনি। প্রমিত বাংলা শব্দের পাশাপাশি স্থানীয় শব্দের সংমিশ্রণে এক নতুন শব্দলঙ্কার তৈরি করার দক্ষতাও অর্জন করেছেন তিনি। ফলে তার কবিতা খুব সহজেই ছুঁয়ে যায় বোধের সকল স্তর।



পেশায় শিক্ষক কবি আকমাল ছাত্র পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকেই লিখে ফেলেন কবিতা। তারপর সেই কবিতা মনের মত হলেই পাঠিয়ে দেন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায়। এপার বাংলা ও ওপার বাংলা মিলিয়ে প্রায় দুই শতাধিক পত্রিকায় নিয়মিত ছাপা হয় তাঁর লেখা। তার লেখা কবিতা ছাপা হয়েছে ঐতিহ্যবাহী সাহিত্য পত্রিকা দেশ, উত্তরের সারাদিন, উত্তরবঙ্গ সংবাদ, কলম, গতি, মিজান, উত্তর বাংলা সংবাদ পত্রিকা সহ আসাম, ত্রিপুরা ও বাংলাদেশের কিছু ঐতিহ্যবাহী দৈনিক সংবাদপত্রে।

সহজ কথা সহজ ভাবে বলা কঠিন। কবি আকমাল তাঁর কবিতা রচনার মাধ্যমে সেই কঠিন কাজই করছেন নিরলস ভাবে। দেশ-কাল-রাজনীতির জটিল সমীকরণ সহজ অক্ষরে তুলে রাখেন তিনি। আজীবনই মেহনতি মানুষের কাছাকাছি থেকেছেন কবি আকমাল। তাই অবলীলাক্রমেই তাঁর কবিতায় ঠায় পায় মেহনতি জন জীবনের চালচিত্র।

বয়স বাড়লে জীবন বিষয়ক মানুষের ধারণা বদলায়। বদলায় আত্ম যাপনের এক আপাত সংজ্ঞা। অনন্ত মহাজাগতিক কর্মকান্ডের ভিড়ে মানুষ নিতান্তই একা। তার বিবেকের কাছে কেউ যেন এসে ভীড় করতে পারে না। বরং তার বিবেক তরী এ ঘাট থেকে সে ঘাটে অভিজ্ঞতা ফেরি করে করে বেড়ায়। নিজের অভিজ্ঞতা ফেরি করার বিনিমিয়ে কুড়িয়ে নেয় অন্যের অভিজ্ঞতা এবং দেয়া নেয়ার এই পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়ায় সে নিজেকে সমৃদ্ধ করে। তৈরি করে বাঁচার জন্য এক নিজস্ব মূল্যবোধ। ধর্মীয় মূল্যবোধ বা মতবাদগত মূল্যবোধ মানুষের সেই নিজস্ব মূল্যবোধ তৈরিতে সাহায্য করে যা ব্যবহার করে মানুষ জীবনর পথে করে নেয় ঠিক, ভুলের বাদ বিচার।

কবি আকমাল আত্মার কথা বলেন তাঁর কবিতায়। বলেন আত্মকথা। বলেন আত্ম পরিশ্রুতকরণের কথা। আধ্যাত্মিকতার এক এবং একমাত্র সিদ্ধান্ত আত্ম-আত্মার আত্মীয় হওয়া। সেই আত্মীয় হওয়ার কথা ধর্ম যেমন ভাবে বলেছে, লোকায়ত জীবন দর্শনের পুরোধা, জ্ঞান তাপস লালন সাঁইও বলছেন অন্তরের আরশি নগরে বসবাসকারী পড়শীর সাথে যোগাযোগ রাখতে। সাধারণ যাপিত জীবন যেমন তার কবিতার বাঁকে বাঁকে হটাৎ দাঁড়িয়ে পড়েছে ঠিক তেমনই তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক অনুশীলন প্রতিভাত হয়েছে স্বাভাবিক ভাবেই। ভাবনায় যেমন তিনি ক্লিয়ার, কবিতার ভাব প্রকাশ তেমনই নির্মেদ।

কবিতার পাশাপাশি মধ্যবঙ্গের লোকজীবন ও লোক সাহিত্য-সাংস্কৃতি নিয়েও নিয়মিত কলম ধরেন তিনি। মালদহ জেলার সুজাপুরে জন্ম তার। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর লেখায় স্থান পায় আম ও রেশম ব্যবসা কেন্দ্রিক প্রান্তিক জীবন গাঁথা যা তথা কথিত প্রথম শ্রেণীর বাংলা সাহিত্যে বরাবর দেখেছে বঞ্চনার মুখ। স্থানীয় ভাষা ও ঐতিহ্য নিয়েও বরাবরই আগ্রহ তাঁর। লোক জীবন বিষয়ক গবেষণামূলক প্রবন্ধে গ্রামীন জীবনে ব্যবহৃত প্রবাদ-প্রবচনের তাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক যেমন উল্লেখ করেন তেমনি তিনি ভালোবাসেন কালিয়াচকের আঞ্চলিক ভাষায়ও কবিতা লিখে ভাষাটির ধারাবাহিকতাকে অক্ষুন্ন রাখতে। সম্প্রতি কালিয়াচকের ভাষায় লেখা একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পথে। পরীক্ষামূলক ভাবে আঞ্চলিক শব্দগুচ্ছের মধ্যে আধুনিক ভাবদর্শন মিশিয়ে কালিয়াচকের ভাষায় কবিতা লিখছেন তিনি।

সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তার কাব্যগ্রন্থ 'হামরা কালিয়াচকের লোক'। তথাকথিত প্রমিত বাংলা ভাষার বাইরে বাংলা ভাষার যে অস্তিত্ব আছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় গ্রাম বাংলায় ব্যবহৃত আঞ্চলিক ভাষার মাধ্যমে। বিশ্বায়নের যুগে আঞ্চলিক ভাষার উপর প্রভাব পড়ছে খুব। তাই আঞ্চলিক ভাষাকে অবিকৃত রাখতে বা বাঁচিয়ে রাখতে কলম ধরছেন বর্তমান সময়ের বহু কবি-সাহিত্যিক। গ্রামে গঞ্জে গড়ে উঠছে আঞ্চলিক ভাষা রক্ষা কমিটি। লেখার পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ার কন্টেন্টের ভাষায়ও ব্যবহার করা হচ্ছে আঞ্চলিক ভাষা, যেন আর যা'ই হোক ভাষাগুলো বেঁচে থাকুক অবিকৃত ভাবে। কলকাতা কেন্দ্রিক পাঠ্যপুস্তক নির্ভর ভাষায় লিখিত সাহিত্য কিংবা বিনোদনমূলক সংলাপে মানুষের মন যখন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে তখনই গ্রাম বাংলার ভাষায় এক রাশ ভালোবাসা মিশিয়ে বানানো এই সব কন্টেন্ট মানুষকে দিচ্ছে প্রাণের সুখ। সেই ধারা বজায় রাখতে ও কালিয়াচক এলাকার ভাষাকে যথাযথ মর্যাদা দিতে মালদহ জেলার কালিয়াচকের ভাষায় কবিতা রচনা করেছেন কবি আকমাল হোসেন। সম্প্রতি শেরশাবাদিয়া বিকাশ পরিষদ থেকে প্রকাশিত 'হামরা কালিয়াচকের লোক' কাব্যগ্রন্থটিতে প্রকাশিত হয়েছে সেই কবিতাগুলোই।

তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলি হল বিস্রস্ত বাস্তবতা (২০০৮), প্রেম, প্রিয়াপুষ্প ও পড়ন্ত বিকেল (২০১০), কমরেডের ডাইরি (বুদ্ধ পূর্নিমা-১৪১৮), মিনার হোসেনের ঘর উঠোন (২০১২), ভাতের ঠিকানায় কাঁদে ভারতবর্ষ (২০১২  ১০,জানুয়ারি), পৃথিবীর একলা কমন রুম (২০১৫)  ও ছেঁড়া কাফনের মেঘ (৭ ফেব্রুয়ারী (২০২১), হামরা কালিয়াচকের লোক (২০২২) খাতা কম্বলের কবিতা (২০২৩), ও অলিখিত দাম্পত্যের অপ্রকাশিত পদাবলী (২০২৩)।

কবি হিসেবে আকমাল যেমন সফল, সাহিত্য চর্চা বিষয়ক উদ্যোক্তা হিসেবেও তিনি সমান ভাবে পরিচিত। নিজে যেমন কবিতা লেখেন তরুণ প্রজন্মের কবিদেরও তেমন ভাবে শিখিয়ে দেব কবিতা চর্চার জটিল ব্যাকরণ। নিজস্ব কাব্য গ্রন্থ প্রকাশের পাশে পাশি সংকলিত করেছেন একটি সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থও। গ্রন্থের নাম গ্রাম মালদা  কবিতা (২০১৩)।

কবিতা চর্চার আঙিনায় যারা নতুন তাদের স্থান দিয়েছেন তার এই কাব্যগ্রন্থে। নতুন কবিদের কবিতা চর্চায় উৎসাহ দেয়ার জন্য শুধু কাব্য সংকলন নয় ১৯৯৯ থেকে 'যত্রিক' কবিতা পত্রিকা সম্পাদনা করেন। এছাড়া গৌড়বঙ্গ সাহিত্য পত্রিকা' 'নয়া কাফেলা' পত্রিকার সহ সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন। এহেন সাহিত্যিক কর্ম কাণ্ডের জন্য পেয়েছেন গৌড়বঙ্গ সাহিত্য সম্মাননা ২০০৪, একাডেমি অফ বেঙ্গলি পোয়েট্রি ২০১০, শহীদ উদ্দিন খান পুরস্কার ২০১৯, দাল্লা সাহিত্য সম্মান ২০২০, কবি শওকত আলী সাহিত্য সম্মান ২০২২, সেরা দশ উজান সম্মান ২০২২, কাব্য সম্মান পাকুয়া হাট বইমেলা ২০২২, সাহিত্য সংস্কৃতি সম্মাননা ২০২২, গুণীজন সম্মাননা ২০২০ কালিয়াচক বই মেলা সহ আরও অনেক সম্মাননা পুরস্কার।

সাহিত্য সাধনার দুর্গম পথ একা অতিক্রান্ত করা বেশ দুঃসাধ্য। কবি আকমালের এই কঠিন পথ চলাকে সহজ করেছেন তার সহধর্মিণী মিনারা হোসেন ও তার তিন কন্যা সন্তান। মিনারা হোসেনের প্রতি এক রকম কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতেই কবি আকমাল লিখছেন তাঁর  মিনার হোসেনের ঘর উঠোন (২০১২) কাব্যগ্রন্থটি। সেই কাব্য গ্রন্থের ছত্রে ছত্রে তুলে ধরেছেন দাম্পত্য জীবনের বারোমাস্যার কথা।

 

লেখা: হাসান উজ জামান আনসারী

Comments