কালিয়াচকের জোলহা সম্প্রদায়ের বিবাহরীতি
হাসান উজ জামান আনসারী
মাত্র একশো নয়টি গেটের বিষয়। ফারাক্কা ব্যারেজের একশো নয়টি গেট পেরোলেই যেন অন্য পৃথিবী, যেন আম, লিচু, রেশম চাষসহ অন্যান্য চাষাবাদের এক অনন্য বিচরণ ক্ষেত্র। যেন এখানকার মানুষ আরো বেশি, যেমনটা ইংরেজি জানা মানুষেরা বলে থাকেন, ডাউন টু আর্থ। তো সেই মাটির কাছাকাছির মানুষেরা গঙ্গা নদীর পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত তাদের একান্ত আপনার এই বাসভূমিকে সোহাগ করে ডাকেন কালিয়াচক নামে। তিনটি ব্লক মিলিয়ে বিশাল এই ভূখণ্ডে বাস করে তথাকথিত স্ট্যান্ডার্ড বাংলা ভাষা ব্যবহারকারী মানুষ সহ আরো চারটি উপভাষা ব্যবহারকারী মানুষ। উপভাষা ব্যবহারের নিরিখে এই এলাকার মানুষকে চারটি সম্প্রদায়ে ভাগ করা যেতে পারে। জোলহা সম্প্রদায়, খোট্টা সম্প্রদায়, শেরশাবাদিয়া সম্প্রদায় ও চাঁই সম্প্রদায়। চাঁই সম্প্রদায় বাদে বাকি তিনটি সম্প্রদায়ের মানুষ বাঙালি মুসলিম। বিশ্বাসে মুসলিম কিন্তু আচারে ব্যবহারে খাবারে পোষাকে ভাষায় এবং ভাবে ষোলো আনায় বাঙালি।
![]() |
| ফারাক্কা ব্যারেজের একশো নয়টি গেট পেরোলেই যেন অন্য পৃথিবী... |
অখন্ড বাংলার নিরিখে যদি দেখা যায়, বাঙালি মুসলিম মানুষের সংখ্যা কিন্তু নেহাত কম না। তারপরেও বাঙালি ও মুসলিম ধর্মীয়-জাতিগত দুই পরিচয় (identity) পাশাপাশি বসে বাঙালি মুসলিম একটি মিশ্র (syncretic) সংস্কৃতির জাতি সৃষ্টি আপাত ভাবে অনেকের কাছেই বিরোধাভাস (oxymoron) বলে মনে হলেও এ জাতির অস্তিত্বকে পুরোপুরি কাকতলীয় বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বাংলার প্রথম জনগণনা হয় ১৮৭২ সালে। সেই জনগণনার আগে কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের ধারণা ছিল যে, বাংলা মানেই বাঙালি হিন্দুদের বাসস্থান, বাঙালি মুসলিম মানুষও যে বাস করে এই বাংলায় সে সবের ধারণা ছিল না তাদের। তাই জনগণনার ফলাফল দেখে রীতিমত বিস্মিত হয়েছিলেন তারা। জনগণনায় দেখেছিলেন ২৮৮ জন হিন্দুতে ১০০০ জন মুসলিমকে। তারা আরো বিস্মিত হয়েছিলেন এটা দেখে যে, বেশ-ভূষা, আকারে প্রকারে এক রকম দেখতে এই মানুষগুলোকে আলাদা করে চেনার কোনো জো নেই। হটাৎ বাঙালি প্রদেশে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে বাঙালি মুসলিম পরিচয়ে পরিচিত হওয়া কোনো একদিনের ঘটনা নয়। আবার বিষয়টি এমনও নয় যে গায়ের জোর পূর্বক কাউকে কোনো ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা হয়েছিল, বিশেষ করে বাংলার ক্ষেত্রে, বরং এক্ষেত্রে বিষয়টি কী হয়েছিল সে বিষয়ে জয়া চ্যাটার্জির 'The Bengali Muslim: A Contradiction in Terms? An Overview of the Debate on Bengali Muslim Identity' প্রবন্ধটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, Most of the first Muslim “converts” were tribal forest-dwellers only weakly influenced by Sanskritic civilization. They did not “convert” from Hinduism to Islam: instead they incorporated “Islamic” superhu-man agencies into dynamic local cosmologies. আর এই সরাসরি ধর্মান্তরিত না হয়ে এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের আঙ্গিক ও বিশ্বাস নিজের প্রাত্যহিক অনুশীলনের মধ্যে এনে ধীরে অন্য এক ধর্মীয় আঙ্গিকে পর্বসিত হন বলেই হয়ত (শুধু এই একটা কারণ নয় এই রকম বহু যুক্তিযুক্ত কারণ তথ্য দিয়ে বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায়ের উত্থানের বিষয়ে লিখেছেন অসীম রায় ও রিচার্ড এম ইটন) বাঙালি মুসলিম পরিচয়ের একটি মিশ্র সম্প্রদায় ও সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।
![]() |
| রেশম গুটির (কুয়া) কাজে ব্যস্ত জীবন... |
কালিয়াচকের জোলহা সম্প্রদায়ের বাস কালিয়াচক শহরের পূর্ব দিকের গ্রাম শেরশাহি, আলিপুর, আগামিল্কি, মহেশপুর, মারুপুরসহ সংলগ্ন গ্রামসহ মেহেরাপুর, বাবলা, মাহাদা পুর, কাশিম বাজার, ঘুসকি টোলা, ছোট মহাদা পুর, ভাগলপুর, দারিয়াপুর, জালালপুর, সুজাপুর চাষ পাড়া প্রভৃতি গ্রামে। নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে এই সম্প্রদায়ের মানুষের মুল পেশা কাপড় বোনা। আগে বুনত শাড়ি, গামছা আর লুঙ্গি। সেই নিজের হাতে বোনা শাড়ি, গামছা, লুঙ্গি নিয়ে পাড়ি দিতেন গ্রাম, গঞ্জের বিভিন্ন হাটে। কাপড় বোনার পাশপাশি এই সম্প্রদায়ের মানুষ হাত দিয়েছিল রেশম চাষে। পালা করে বছরে দুই থেকে তিন বার পলু পোকা বা রেশম গুটির চাষ করত তারা। রেশম গুটির খাবার জোগান দেবার জন্য চাষযোগ্য জমিতে লাগাত তুঁত পাতা। রেশম গুটির খাবারের জন্য নিজের সময় মাফিক তুঁত পাতা কেটে আনত তারা।
এখন অন্য সময়। এখন অন্য যুগ। সময় বদলেছে। তাই বদলে যাচ্ছে মানুষের হাতের কাজ, পেশা। আগে যে মানুষগুলো গ্রামে থেকেই রেশম চাষ আর কাপড় বোনার মত কাজে ছিল সিদ্ধহস্ত তারা এখন হাত দিয়েছেন বাইরে থেকে পাইকারি রেটে থান কাপড় এনে মশারী, প্যান্টসহ অন্যান্য পরিধেয় বস্ত্র বানাতে। তো এমন খেটে খাওয়া মানুষ, আগেই বলেছি মাটির কাছাকাছির মানুষ, তাদের জীবনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বিবাহ কর্ম সাধন পর্ব সম্পন্ন করেন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ধূমধাম করে।
১. বিবাহ পূর্ববর্তী লোকাচার-
ক. কনে দ্যাখা/ বহু দ্যাখা/ জামাই দ্যাখা- গ্রামীণ জীবন। জল আর মাটির জীবন। আম গাছ আর লিচু গাছের জীবন। সেই জীবনের আনন্দ উৎসবে তাই লেগে থাকে মাটির গন্ধ, থাকে মানুষের পরম যত্নের স্পর্শ। আর পাঁচটি সমাজের মানুষের মতই জোলহা সম্প্রদায়ের বিবাহ পর্ব শুরু হয় কনে আর পাত্র দেখার শোনার মাধ্যমে। তাই শুরু হয় খোঁজ পর্ব। এ গ্রাম, সেই গ্রাম, এই বংশ, সেই বংশের মধ্যে গিয়ে চলতে থাকে খোঁজ পর্ব। পাত্রর মা, মাসি, পিসি শুরু করেন কনে দেখা পর্ব। দূর সম্পর্কের মাসি, নানা, পিসি, ফুফা, দাদা, ভাবি, বন্ধুসহ অনেকেই খুজতে সাহায্য করেন পাত্রী। পাত্রী দেখা পর্ব হয় অনেক মজাদার। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই কনে দ্যাখা/ বহু দ্যাখা/ জামাই দ্যাখা পর্ব অনেকটা পণ্য দ্রব্য খরিদ করার মত একটা পর্বে পর্যবসিত হয়েছে। পণ্য খরিদের সময় মানুষ যেমন সেই দ্রব্যের পছন্দের দিক, অপছন্দের দিক যাচ বিচার করার পর খরিদ করে কনে দ্যাখা/ বহু দ্যাখা/ জামাই দ্যাখা পর্ব অনেকটা সেই যাচ বিচার করার মতই। এই পর্বে পাত্র পক্ষের আত্মীয় কন্যা পক্ষের বাড়িতে গিয়ে কন্যার বিষয়ে বিস্তারিত জেনে নেন। কন্যার শিক্ষাগত যোগ্যতা, সাংসারিক কর্মের দক্ষতা আর পারদর্শীকতাও আলাপ আলোচনার মাধ্যমে জেনে নেন খুঁটিয়ে। বাদ থাকে না পাত্রীর বাবা ও দাদাদের ব্যাবহার ও বিষয় আশয় সম্পর্কে জানতে।
আসলে ভারতীয় সংস্কৃতে বিবাহ বিষয়টি একটি কনের সাথে একটি পাত্রের শুধু নয়, একটি পরিবারের সাথে যেন আর একটি পরিবারেরও। এ বিষয়ে এখনকার সময়ের প্রখ্যাত ইংরেজি উপন্যাসিক চেতন ভগতের উপন্যাস Two States এর পেছনের কভারে খুব ভালো ভাবে লেখা আছে, "Love marriages around the world are simple: Boy loves girl. Girl loves boy. They get married. In India, there are a few more steps: Boy loves girl. Girl loves boy. Girl’s family has to love boy. Boy’s family has to love girl. Girl’s family has to love boy’s family. Boy’s family has to love girl’s family. Girl and boy still love each other. They get married."
আর কালিয়াচক ভারতের বাইরে নয়। তাই হয়ত কালিয়াচকের জোলাহা সম্প্রদায়ের মানুষরাও একটি পরিবারের সাথে অন্য পরিবারের মন, মানসিকতা মিলছে কি না সে বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে দেখে নেন ভালো ভাবে।
কনে দেখা পর্ব শুরু হয় প্রশ্ন পর্বের মাধ্যমে। প্রথম দফার বৈঠকে কনে দেখতে যান পাত্রের মা, কাকিমা, মাসীমারা। তারা কনেকে পাশে বসিয়ে জানতে চান কনের পড়াশোনা কতদূর, বাড়ির কাজ পারে কি না, পাত্রের পরিবারের আর্থিক অবস্থা অনুযায়ী জানতে চান সংসারের কাজ ছাড়া উপার্জনের জন্য আরো অন্যান্য কাজ যেমন বিড়ি বাঁধা, কাপড় সেলাই করা ইত্যাদি জানে কি না, ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান কেমন, কোরআন তেলাওয়াত করতে জানে কি না, নামাজ আদায় করে কি না ইত্যাদি ইত্যাদি।
প্রথম বৈঠকে কনেকে পাত্র পক্ষের মা মাসীদের পছন্দ হলে দ্বিতীয় দফায় কনে দেখতে আসে পাত্র পক্ষের বাবা, ভাই, নানা, মামা ও বন্ধুরা। তারা কনে দেখেন ভালো ভাবে। কনের বোধ মূলক জ্ঞানের পরিধি মাপার জন্য মস্করা করে কিছু প্রশ্ন করেন পাত্র পক্ষের অতিথি বর্গ। কন্যা তার জ্ঞান আর সাধ্য মত জবাব দেন সাধ্য মত। পাত্র পক্ষ মজার কিছু ধাঁধার উত্তর জানতে চান পাত্রীর কাছে। পাত্রী জানলে উত্তর দেন। নইলে নিরুত্তর থাকেন। পাত্রের মামা বা নানা গোছের বয়োজ্যেষ্ঠ আত্মীয় পাত্রীর কাজে জানতে চান পরম করুণাময় আল্লাহপাকের ইবাদত সে ঠিক মত করে কি না, করলে সেই ইবাদত বা নামাজের নিয়ম-কানুন বা রীতিনীতি কি ইত্যাদি, ইত্যাদি। পাত্রী তার সাধ্য অনুযায়ী উত্তর দেন। সব শেষে আসে পাত্রীর গাণিতিক মেধা যাচাইয়ের পর্ব। এই পর্ব শুরু হয় ঠিক অন্য ভাবে। পাত্র পক্ষ থেকে কনেকে যত জন দেখতে আসেন তারা একে একে কনের ও কনে পক্ষের পিতা-মাতা আত্মীয় স্বজনদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে কন্যার হাতে নিজেদের সামর্থ মত কিছু টাকা তুলে দেন। একে একে সবার দেওয়া শেষ হলে কন্যার কাজে জানতে চান তাকে ঠিক কত টাকা দেওয়া হল। এই রকম এক মজাদার পর্বকে আরো মজাদার করতে কিংবা কনেকে কিঞ্চিৎ বিপাকে ফেলতে কনেকে পক্ষের কেউ কেউ খুচরো পয়সা (বর্তমান সময়ে অচল হলেও) যেমন পঞ্চাশ পয়সা, পঁচিশ পয়সা দিয়ে কনেকে মোট প্রাপ্ত পয়সার হিসেব দিতে বলেন যাতে করে বুঝে নিতে সুবিধা হয় হিসাব-কিতাব রক্ষার দিক কনে কতটা পরিণত মস্তিষ্কের।
পাত্র পক্ষের অথিতি বর্গের আপ্যায়নের জন্য সেদিন সাজ সাজ রব থাকে কন্যার পিতার বাড়িতে। মেহমানদারীর জন্য রান্না হয় বিভিন্ন পদের খাবার। কনেকে পাত্র পক্ষের পছন্দ হলে দফায় দফায় পাত্র পক্ষের বাড়িও যায় কনে পক্ষের আত্মীয় স্বজন। আর দুই পক্ষের মধ্যে দুইয়ে দুইয়ে চার হলেই, মানে মনের মিল হলেই শুরু হয় পাকা কথা বলা।
খ. বসার দিন/ মাথা বাহানা/ আশীর্বাদ - একটি জাতি তার নির্দিষ্ট একটি অনুষ্ঠানের নাম কি রাখবে না রাখবে তা নির্ভর করে সেই জাতিটির ঠিক কোন শব্দ সেই অনুষ্ঠানের সাথে বা সেই প্রসঙ্গের সাথে যায় সেই শব্দটি। মাথা বাহানা শব্দ দ্বয়কে নিয়ে একটু গুছিয়ে বললে আশা করি বিষয়টি আরো বুঝতে সুবিধা হবে। মাথা বেঁধে দেওয়া শব্দ কালিয়াচকের আঞ্চলিক ভাষায় মাথা বাহানা। আসলে বিষয়টি মাথা বেঁধে দেওয়া না, বরং চুল বেঁধে দেওয়া। গ্রামীন জীবনে মা চুল বেঁধে দেন মেয়ের। সেই চুল বেঁধে দেওয়াকেই কালিয়াচকের ভাষায় বলে মাথা বাহানা। তবে আশীর্বাদ পর্বকে মাথা বাহানা পর্ব কেন বলে, এই আলোচনায় আশা করি ধীরে ধীরে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।
কথা পাকা যখন একে বারেই হয়ে গেছে, বাজনা তখন থেকেই বাজতে শুরু করতে বিয়ের। না, এই বাজনা আমরা যারা বাইরের লোক, মানে যাদের মধ্যে বা যাদের বাড়িতে বিয়ে হচ্ছে না তারা কেউ শুনতে পাব বা পাবেন না। পাবে যে কনের সাথে বিয়ে হচ্ছে যে পাত্রের আর যে দুটি পরিবারে বিয়ে হচ্ছে সেই পরিবারগুলোর সকল সদস্যরা। কারণ মধুরতম এই বাজনার শব্দ বাজে দারুণ নীরবে। সম্পর্কের নিদারুণ মধুময়তা দারুণ নীরবেও কিভাবে ভাবে শ্রুতিগোচর হয়ে ওঠে অর্থাৎ একে ওপরে শুনতে পায় সে বিষয়ে একটি দারুণ ব্যাখ্যা মনে পড়ছে আমার।
ব্যাখ্যাটি জানার আগে ব্যাখ্যার প্রশ্নটি একবার ঝালিয়ে নিই। প্রশ্নটি হল ঠিক এমন, মানুষ যখন ভালোবাসার মধ্যে থাকে, একে অপরের ভালোলাগার মধ্যে থাকে তখন তারা ধীরে কথা বলে কেন? আর যখন তাদের মধ্যে ঘটে তীব্র মনোমালিন্য বা একে বারেরই একে অপরকে দেখতে না পারার মত পরিস্থিতি যখন সৃষ্টি হয় তখনই বা তারা একে অপরের উপর রেগে গিয়ে, বিরক্ত হয়ে চেঁচিয়ে কথা বলে কেন। একজন ব্যক্তি ঠিক এই সওয়ালটি করে বসলেন এক সাধুকে। তিনি দিলেন সেই সওয়ালটির মনোমুগ্ধকর জবাব। বললেন, মানুষের মধ্যে মানুষের সম্পর্ক হয় হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের। একটি মানুষের হৃদয়ের থেকে আর একটি মানুষের হৃদয়ের দুরুত্ব যত কম তাদের ভালোবাসার, ভালো লাগার গাঢ়ত্ব তত বেশি। পক্ষান্তরে, একটি মানুষের হৃদয়ের দূরত্ব অন্য একটি মানুষের হৃদয় থেকে যত বেশি তাদের মধ্যে ভাব, ভালোবাসা, পেয়ার-মহব্বত ততই কম। কারণ একটি হৃদয়ের থেকে আর একটি হৃদয়ের দূরত্ব বাড়লে একে ওপরের কথা শোনার জন্য আগে সেই হৃদয় জনিত দুরত্ব অতিক্রম করতে হয়। আর সেই অতিক্রম করার জন্যই, একে অপরের সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে থাকা মানুষ, খুব চেঁচিয়ে বা উচ্চ স্বরে কথা বলে থাকে যাতে করে দ্বিতীয় ব্যক্তিটি শুনতে পায়। পক্ষান্তরে, যে মানুষের হৃদয়ের থেকে ওপর একটি মানুষের হৃদয়ের দূরত্ব যত কম তাদের একে অপরের কথা শুনতে বা ভাব ভালোবাসা বুঝে নিতে তেমন কষ্ট করতে হয় না, তাই তারা তাদের মধ্যে কথা বলে নিচু স্বরে, বিনীত ভাবে। মাঝে মাঝে এমন ভাব-ভঙ্গিতে কথা বলে যে বাইরের কেউ আর সে শুনতে পায় না, বুঝতেও পারে না।
বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হলে ঠিক এমনই পেয়ার, মহব্বতের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় পাত্র, কনে ও তাদের পরিবারের মধ্যে। আর এই পরিবেশেই তাই যেন সংশ্লিষ্ট সকলের বুকের মধ্যে বেজে ওঠে সুখের মত ব্যাথা যা বাইরের কারোর পক্ষে বোধগম্য হয় না। তো সেই ব্যাথায় কাতর দুই পরিবার এক সাথে বসে বসার দিন/ মাথা বাহানা/ আশীর্বাদ এর দিন নির্ধারণ করেন বিবাহ পর্বের সকল দিন -তারিখ । মাথা বাহানা পর্ব বা আশীর্বাদ পর্ব চলে সারা দিন ধরে। তাই বিষয়টি বোঝার সুবিধার্থে এই দিনটিকে আমরা ভাগ করতে পারি তিনটি পর্বে।
প্রথম পর্ব শুরু হয় মাথাবাহানার দিনের সকালে। সকালে পাত্রের দুলহা ভাই কিংবা দাদা গোত্রীয় কেউ পাত্রীর বাড়িতে আসবেন পরিমাণ মত মাছ (সামর্থ অনুযায়ী বা বেশির ভাগ সময় দশ কেজির বেশি) আর মুখ মিষ্টির জন্য খই, বিরনি, বাতাসা নিয়ে। সামর্থবান অনেকে মাছের বদলে দিয়ে আসেন খাসিও। আর এই সব সামগ্রী নিয়ে আনার মাধ্যমেই শুরু হয় মাথাবাহানার প্রথম পর্ব। যিনি আনেন পাত্রী পক্ষ তাকে সম্মান জানাতে একটি লুঙ্গি উপহার দেন ও তার যত্ন আপ্যায়ন করেন।
পাত্র পক্ষের তরফে আসা মাছ কাটার পালা শুরু হয় এখন। মাছ কাটার আগে, নিয়ম অনুযায়ী, পাত্রী পক্ষের মা, কাকিমা, দাদি, পিসি, নানী পাত্র পক্ষের তরফে আসা মাছ দেখবার জন্য ডাকতে যান প্রতিবেশী মহিলাদের। প্রতিবেশী মহিলারা এলে হাত দিয়ে উল্টে পাল্টে নাড়েন সেই সব মাছ। মাছ কাটা শেষ হলে শুরু হয় মাছ কাটা পর্ব। মাছ কাটতে হাতে থাকে বঁটি আর মুখে থাক গীত। পাত্র পক্ষের বাড়ি থেকে যত মাছ আসে, মাছ কাটা হলে পরে, সে সমস্ত মাছকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। এক ভাগ প্রতিবেশীদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয় আরবাকি ভাগ বিকেলে পাত্র পক্ষের যে সব মেহমান আসবেন তাদের জন্য রেখে দেওয়া হয়। তবে মাছ কাটতে কাটতে নানী, দাদি, মাসি, কাকিমারা গাইতে থাকেন মাছ কাটার গীত-
মাছ কুটিতে গে মা, মাছ কুটিতে গে মা
হাসুয়া ভাইঙা গেল গে মা
এ কোন চিতলের মাছ গে মা, এ কোন চিতলের মাছ
মাছ ধুইতে গে মা, মাছ ধুইতে গে মা
হাতে কাঁটা গড়িল গে মা
এ কোন চিতলের মাছ গে মা, এ কোন চিতলের মাছ
মাছ ভাজিতে গে মা, মা ভাজিতে গে মা
হাঁড়ি ভাইঙা গেল গে মা
এ কোন চিতলের মাছ গে মা, এ কোন চিতলের মাছ
মাছ খাইতে গে মা, মাছ খাইতে গে মা
গলাতে কাঁটা গড়িল গে মা
এ কোন চিতলের মাছ গে মা, এ কোন চিতলের মাছ
শব্দ চয়ন আর ঘটনা বর্ণনা থেকেই বোঝা যাচ্ছে পাত্রী পক্ষের নানী, কাকিমামারা একটি দারুণ সময়ের মধ্যে এসে উপনীত হয়েছেন। যেখানে তাদের মনে এবং মননে যেন শুধু ভালো লাগার, মস্করা করার ঢেউ যেন মুহুর্মুহু আছড়ে পড়ছে। সেই ভালো লাগার ঢেউ মাখতে মাখতেই কেটে যায় বেলা। শুরু হয় প্রথম পর্বের অন্তিম যাত্রা। বেজে বাসন কাসনের শব্দ। রান্না বসেছে উননে আর শুরু হয়েছে দ্বিতীয় পর্বের তোড়জোড়।
জোহরের নামাজ শেষ হয়ে'পর শুরু হয় আসরের আজান। ঠিক সেই রকম একটা সময়ে শুরু হয় মাথাবাহানা পর্বের দ্বিতীয় পর্ব।
তো যেমন টা আগে বললাম, আসরের নামাজের পরেই শুরু হয় মাথা বাহানা পর্বের দ্বিতীয় পর্ব। দ্বিতীয় পর্বে পাত্র পক্ষের বাড়ি থেকে আসেন পাত্রের ভাবি, দিদি, বোন, মাসি পিসি গোছের আত্মীয়ারা। সাথে আসেন বয়োজ্যেষ্ঠ বাবা, কাকা, দাদু। তাদের কাজ তৃতীয় পর্বে। দ্বিতীয় পর্ব জুড়ে শুধু থাকেন দুই পক্ষের মেয়ে-মহিলারা। মাথা বাহানা পর্বের মাধ্যমে আসলে পাত্র পক্ষ পাত্রী পক্ষকে দেওয়া 'পাকা কথা'র প্রতি সম্মান জানাতে চান। আর এই সম্মান প্রদর্শনের জন্যই, বলা ভালো পাত্রীকে বিয়ে করে নিয়ে যেতে তারা যে এক পা এগিয়ে, তাই তারা পাত্রীকে নিজেদের পছন্দ সামগ্রী বাড়ি থেকে নিজের হাতে সাজিয়ে দেন পাত্রীকে। আর এই সযত্নে নিজস্ব ঢঙে সাজিয়ে দেওয়া, চুল বেঁধে দেওয়া যাকে কালিয়াচকের ভাষায় বলে মাথা বেঁধে দেয়ার জন্যই এই পর্বের নাম মাথা বাহানা।
পাত্র পক্ষের মেয়ে-মহিলারা পাত্রীকে সাজিয়ে গুছিয়ে তকতকে করে দেওয়ার জন্য বাড়ি থেকে ব্যাগে করে নিয়ে আসেন পরিচর্যা সামগ্রী। সেই ব্যাগকে, স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ডালা। ডালার মধ্যে পাত্রীর পরিধেয় সামগ্রীর মধ্যে থাকে শাড়ি, সায়া, ব্লাউজসহ অন্যান্য পরিধেয় অন্তর্বাস আর পরিচর্যা সামগ্রীর মধ্যে থাকে লারা, ডোরা, ফিতা, আলতা, চিরুনি, লিপস্টিক, আই লাইনার, নেইল পলিশ, রুল কাজল ও আউলা-সাউলা। আউলা-সাউলা হল এক ধরণের ফল। আউলা-সাউলা অবশ্য রাখা হয় ডালার মধ্যে থাকা এক রুমালের ভেতর। নিয়ম হল, সেই রুমালের মধ্যে আউলা-সাউলা ফল রাখার সাথে সাথে রাখতে হবে টাকা। পাত্রী পক্ষের যিনি সেই রুমাল খুলবেন তিনিই নিতে পারবেন সেই টাকা। এর পর শীল নোড়ায় পিষে ফেলতে হবে আউলা-সাউলা আর এর পর আগে ছয় জন বিবাহিত মেয়ের মাথায় দিতে হবে সেই ফলের নির্যাস তার পর দেওয়া হবে কন্যার মাথাতে।
এখানে একটা বিষয় বলে রাখা ভালো, হয়ত পুরুষ তান্ত্রিক সমাজ বলেই হয়তো নিয়মটা এমন যে, আউলা সাউলা ফলের নির্যাস শুধু মাত্র (তথা কথিত) সৎ চরিত্রের অধিকারী বিবাহিত মহিলার মাথায় দেওয়া হয়। স্বামী পরিত্যক্তা, বিধবা বা তথা কথিত দুশ্চরিত্র মহিলার মাথায় দেওয়া হয় না। সমাজের এই ভিত্তিহীন স্বায়ত্তশাসনের রাঙা চোখ থেকে রেহাই পেতে স্বামীগৃহে নির্যাতিত হয়ে অনেক নারীই বাবার বাড়ি চলে এলেও বিবাহ বিচ্ছেদ করে না।
তো আউলা সাউলা মাথায় দেয়ার পর কনেকে সাজাতে বসে পাত্র পক্ষের মেয়েরা। মুখ ধোয়া থেকে শুরু কাপড় পড়ান পর্যন্ত, মেকআপ কারনো থেকে শুরু করে কনের পায়ে আলতা পড়ানো পর্যন্ত সব কাজই করে পাত্র পক্ষের মহিলারা। কনের পায়ে আলতা পড়ানো হলে পরে সেই আলতা মাখতে বসে বাচ্চারা। গীত গ্রামীন জীবনের একমাত্র ছান্দিক স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ। সময়সামিক চটুল গান গ্রামীন পুরুষদের আনন্দ বেদনার সঙ্গী হলেও মহিলাদের ঠোঁট জুড়ে থাকে লোকজ সুর আর বিশুদ্ধ সাংসারিক শব্দে রচিত তাদের নিজস্ব গীত। তাই কনেকে শাড়ি পড়াতে পড়াতে গীত ধরেন পাত্র পক্ষের মহিলারা। সূর্য তখন ডুব দিয়েছে অন্ধকারের খোলামকুচিতে। আর সেই গ্রামীণ সন্ধ্যার অন্ধকারের সঙ্গী ঝিঁ ঝিঁ পোকাকে বাদ্য বাজনা জ্ঞান করে গীত ধরেন মহিলারা,-
চুল সিসরাইতে সিসরাইতে গে পিঙ্কি
নিনও আসিয়া যে গেল
নিনের কারণে গে পিঙ্কি
ফারুক ঘুইরা গেল
আধা রাস্তা যাইতে রে পিঙ্কি
নিনও ছুটিয়া গেল...
এর পর কনেকে পুরো সাজানো হয়ে গেলে, শাড়ি পড়ানো হয়ে গেলে কনের আঁচলে দেয়া হয় তিন অঞ্জলি খই, বিরনি আর বাতাসা। নিয়ম হল কনে সেই খই, বিরনি আর বাতাসা তার মাকে দেবে এবং কনের মা সেগুলো নিয়ে তার আত্মীয় স্বজনদের দিয়ে দেবেন। বিষয় হল, এই খই বিনিময়ের মাধ্যমে মেয়ে আসলে চুকিয়ে দিল তার মাতৃ ঋণ এমনটাই মনে করেন স্থানীয় মহিলারা।
এই যে এতক্ষণ পাত্র পক্ষের মহিলারা কনেকে সাজানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন তারই ফাঁকে পাত্র পক্ষের তরফে আসা পুরুষ আত্মীয়রা মাগরিবের নামাজ পড়তে যান মসজিদে। আর এই মসজিদেই অনুষ্ঠিত হয় মাথা বাহানা অনুষ্ঠানের তৃতীয় পর্ব। মাগরিবের ফরজ নামাজ শেষে কনের বাবা দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতে আসা বাকি মানুষদের উদ্দেশ্যে বলেন যে আজ তার মেয়ের 'দিন জব' তাই আগ্রহী সকলে সুন্নাত নামাজ আদায়ের পর বসতে পারেন। 'দিন জব' এর 'জব' শব্দটি এসেছে দিন 'জবাব' শব্দটি থেকে। সুন্নত নামাজের আদায় করার পর আগ্রহী সকলে বসে গেলে মেয়ের বাবা সকলকে জানান যে তার মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে এবং পাত্র পক্ষও তার সাথে রয়েছে। পাত্র পক্ষকে সমাজের মানুষ বিবাহের দিন ক্ষণ ঠিক করার জন্য বলেন এবং দুই পক্ষের মতামত অনুযায়ী বিবাহের দিন ক্ষণ ঠিক করেন। এর পর কথা হয় দেন মোহরের নিয়ে। দেন মোহর ঠিক হয়ে গেলে পর কথা হয় মসজিদ উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত কিছু টাকা দেয়ার কথা। আরো জানিয়ে রাখি, বিবাহের দিন মিষ্টি মুখ করানোর জন্য কতটা পরিমাণ বাতাসা, লাড্ডু দেওয়া হবে তাও নির্ধারন করা হয় সকলের সাথে আলোচনা করে।
গ. গায়ে হলুদ- বিয়ের দিন সন্নিকটে তাই তুমুল তোড়জোড় শুরু হয় দুই বাড়িতে। রীতি অনুযায়ী গায়ে হলুদ দেওয়া হয় কনের। কনের গায়ে হলুদ দেয়া হয় বিয়ের দিনের ঠিক তিন/চার দিন আগে। যে দিন কনের গায়ে হলুদ দেওয়া হবে সেদিন ধুয়ে মুছে, আগে মাটির লেপা হত, লেপে তকতকে করে দেয়া হবে বাড়ি ঘর। তো সেই তকতকে করে দেওয়া বাড়ি ঘরেই প্রথমে মেয়ের গায়ে হলুদ দেবে মা। তারপর অন্যান্য প্রতিবেশীরা। নিয়ম হল, প্রথমে বাজার থেকে কিনে নিয়ে আসতে হবে হলুদ। এর পর কাঠ নির্মিত বৃহৎ আকারের হামান দিস্তায় (স্থানীয় ভাষায় ওখল/অখলি) থেঁতলানো হবে সেই কাঁচা হলুদ। তার পর ঠিক আগের মত এখানে সাত জন বিবাহিত মহিলা মাখার পর মাখানো হবে কনেকে। কনের মায়ের বাড়িতে যেদিন গায়ে হলুদ দেওয়া হবে তার পরের কয়েক দিন মানে বিয়ের আগের দিন অব্দি কনের গায়ে হলুদ মাখবেন তার প্রতিবেশীরা। তবে হলুদ কুটার (বাটার) সময় আবার গীত ধরেন মহিলারা,
হলুদ কুটি হলুদ কুটি সোনার ওখলে
বহিন পিসি আয় তোরা সাথে বাড়ি দে
দিদি বুবু আয় তোরা সাথে বাড়ি দে
হলুদ কুটি হলুদ কুটি সোনার মেঝেতে
দিদি বুবু আয় তোরা সাথে বাড়ি দে
খালা ফুপু আয় তোরা সাথে বাড়ি দে
ঘ. নিমন্ত্রণ পর্ব- বিয়ের আর মাত্র দিন কয়েক বাকি আর তারই মধ্যে নিজ সামর্থ অনুযায়ী পাড়া প্রতিবেশীদের আমন্ত্রণ জানানো হয় পাত্র ও কন্যা পক্ষের বাড়ি থেকে। আমন্ত্রণ জানানো হয় আত্মীয় স্বজন, ও বন্ধু বান্ধবীদেরও। নাগরিক জীবনের কেতাদুরস্ততা বিবাহের মত অনুষ্ঠানকে করেছে অনেক ব্যয় বহুল তাই শহরের মানুষ আমন্ত্রিত অথিতিদের এক বেলা খাবারের জন্য আমন্ত্রণ জানান। গ্রাম নির্ভর এই সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে আমন্ত্রণের বিষয় একটু আলাদা। এখানে এক বেলা নয় বরং পাড়া পড়শীদের আমন্ত্রণ জানানো হয় দিনে দুই বেলা খাওয়ার জন্য। অবশ্য নিকট আত্মীয়ের ক্ষেত্রে আরো দুই এক বেলা হয়ত বেড়ে যায়। আমন্ত্রণ জানানো হয় যথেষ্ট আন্তরিকতার সাথে কখনো কার্ড মারফত, আবার কখনো সশরীরে গিয়ে। গ্রামীন মুসলিম সমাজ ব্যবস্থার একটা দারুণ পরিকাঠামোর কথা এখানে উল্লেখ করা খুব জরুরী বলে মনে করছি।
![]() |
| ভোজ বাড়িতে রান্নার কাজে সহযোগিতা করেন পাত্র/পাত্রীর আত্মীয়রা... |
আকীকা একটি আরবি শব্দ। বলা ভালো, আকীকা হল মুসলিম পরিবারে নব জাতকের জন্ম হলে পরম করুণাময়ের প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপনের এক বিশেষ অনুষ্ঠান। আর এই অনুষ্ঠানে পরম করুণাময় আল্লাহর নামে উৎসর্গ করতে হয়ে ছাগল বা খাসি। গ্রামীণ সামাজিক ব্যবস্থা অনুযায়ী ৩৩ টি পরিবার নব জাতকের পরিবারকে এই অনুষ্ঠান আয়োজনে সর্বত ভাবে সহায়তা করবেন। মজার বিষয় হল শুধু নব জাতক প্রাপ্তি লাভের মত একটি সুখময় মুহূর্তেই যে এই কয়েকটি পরিবার তাদের সঙ্গে থাকবেন তা নয়, দুঃখের সময়ও প্রতিটি পরিবারকে অঙ্গীকারবদ্ধ ভাবে থাকতে পরিবারটির পাশে। বিশেষ করে আকিকার মধ্যে, মানে ৩৩টি পরিবারের মধ্যে কোনো সদস্য যদি ইন্তেকাল করেন তাহলে তাদেরকেই কবর খোঁড়া থেকে শুরু করে কাফন দাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। আর তাই, বিশেষ করে বিয়ের সময়, এই ৩৩টি পরিবারকে খুব যত্ন করে আমন্ত্রণ জানানো হয় শুভ বিবাহ বাসরে দুই বেলা আহার গ্রহণের জন্য।
ঙ. গ্রামী থুবড়া- গ্রাম থেকে এসেছে গ্রামী শব্দটি। মেয়ের বিয়ে তাই মিষ্টি মুখ করাতে হয় গ্রামবাসীকে। খাওয়াতে হয় ক্ষির আর মাথা বাহানার সময় পাত্র পক্ষের বাড়ি থেকে আসা খৈও বিলিয়ে দিতে হয় গ্রামের মানুষের মধ্যে। আর একটা কারণ হল এই দিনেই গ্রামের আত্মীয় স্বজনেরা যে কনেকে থুবড়া দিতেন নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সেই থুবড়ার আজ হল শেষ দিন। তাই এই দিনটিকে বলা হয় গ্রামী। তাছাড়া কনের বাড়ির ক্ষেত্রেও এটা শেষ দিন থুবড়া খাওয়ানোর থুবড়া অনুষ্ঠানে কনে বা পাত্রকে তাদের বিয়ের আগের দিন সন্ধ্যা বেলায় ক্ষির খাওয়ানো হয়। ক্ষীরের পাশাপাশি থাকে বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি বা অনেক সময় থাক জাল জাতীয় কিছু তেলে ভাজা। এই থুবড়াই হল শেষ থুবড়া। এর পর কনেকে কিংবা পাত্রকে আর থুবড়া দেওয়া হবে না তাই এই থুবড়া অনুষ্ঠানে যোগদান করেন গ্রামের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা ও বন্ধুরা।
![]() |
| থুবড়ার থালি খাওয়ানো হবে পাত্র ও কন্যা দুজনকেই তবে তাদের নিজ নিজ বাড়িতে... |
থুবড়া মূল অনুষ্ঠান শুরু হয় সন্ধ্যা বেলা। কনেকে বারান্দায় বা উঠোনে বসানো হয়। কনেকে ঘিরে বসে থাকেন কনের আত্মীয়রা। সবার আগে কনের মুখে ক্ষির তুলে দেন কনের বাবা তারপর মা। তারপর একে অন্যান্য বয়োজ্যেষ্ঠ আত্মীয়রা এবং পর পর অন্যান্য বন্ধু বান্ধব ও আত্মীয় স্বজনেরা। নিয়ম হল, কনেকে যখন তার আত্মীয়রা ক্ষির খাওয়াবেন তখন কনেকে আগে কিছু অর্থমূল্য তুলে দিতে হবে উপহার স্বরূপ নইলে কনের পাশে বসে থাকা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা কনের মুখে চেপে ধরবেন রুমাল। এর অর্থ হল কনেকে অর্থমূল্য উপহার না দিলে ক্ষির খাওয়াতে দেবেন না তাকে। এই থুবড়া খাওয়ানোর অনুষ্ঠানের মধ্যেই চলে নিজেদের মধ্যে খোশ গল্পের কথা। আর তার পাশাপাশি আত্মীয়রা গাইতে থাকে বিবাহের গীত,
ত্যালও হলুদ মাইখা হাফেজা রে
বাজারে দাঁড়াইয়া রে ওই বাজারে দাঁড়াইয়া
বাজারে দাঁড়িয়া হাফেজা রে
শিশাফুল গোড়াইয়া রে ওই শিশাফুল গোড়াইয়া
শিশাফুল গড়িয়া হাফেজা রে
আশরাফুলের মহলে যাইয়া রে ও আশরাফুলের মহলে যাইয়া
আশরাফুল বাড্ডা রাগাহি রে ঝাঘাহি
ছিটিয়া ফালাইয়া রে ওই ছিটিয়া ফেলায়
হাফেজা বাড্ডা ভালো হাফেজা রে
চুনিয়া উঠাইয়া রে ওই চুনিয়া উঠায়...
একই অনুষ্ঠান হয় পাত্রের বাড়িতেও।
সময় বদলেছে তাই বদলে প্রসাধনী দ্রব্যের ব্যবহারও। আগে আহে ব্যবহার করা হত পাতা মেহেদি। সেই মেহেদী পাতা দল বেঁধে পাড়তে যেত কনের আত্মীয়-সখিরা। তারপর সযত্নে সেই মেহেন্দি পাতা বেটে হাতে লাগানো হত পাত্রীর। এখন আর মেহেন্দি পাতা তেমন কেউ ব্যবহার করেন না, পরিবর্তে ব্যবহার করেন মেহেন্দির পাওচ। সেই পাওচ ধরেই সযত্নে কনের হাত ভরিয়ে দেয় কনের সখিরা।
চ. ডালা সাজানো পর্ব- আগেই বলেছি বিয়ের তত্ত্ব নিয়ে যাওয়ার ব্যাগকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ডালা। তো সেই ডালা সাজানো হয় আবার। ডালা সাজান বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলারা। সেই ডালায় থাকবে নতুন সংসার শুরু করার প্রয়োজনীয় সামগ্রী। সাথে থাকবে পান, সুপারি ইত্যাদি। ডালা সাজানো হলে নিয়ম করে সেই ডালা দেখানো হবে উপস্থিত অন্যান্য আত্মীয় দের।
২. বিবাহের দিনের লোকাচার-
বহু প্রতীক্ষিত সেই একে বারে হাজির। প্যান্ডেল, সামিয়ানা আর বাহারী আলোর ঝলকানিতে বিয়ের দিন জ্বলে ওঠে কনের বাড়ির চারপাশ। আগে চল ছিল নিজেরাই নিজেদের আত্মীয় স্বজনদের সহযোগিতায় ত্রিপল, বিছানার চাদর ইত্যাদি দিয়ে সাজিয়ে দিত বিয়ে বাড়ি। এখন রীতিমত ডেকোরেটর ডেকে প্যান্ডেল বানানো হয়। তো সেই সাজানো গোছানো বাড়িতে পাত্র পক্ষ তাদের বড় যাত্রী নিয়ে আসেন পাত্রীর বাড়িতে। বর যাত্রীকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ডলি ওলী।
ক. বর ও বরযাত্রী বরণ পর্ব- আগে বর আসত ঘোড়ায়। এখন আসে গাড়িতে। বরের কোলে বসে থাকে এক বাচ্চা। সেই বাচ্চাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় কোল পাছুয়া। বরের গাড়ি কনের বাড়ির কাছাকাছি এলেই বাঁশ নিয়ে দাঁড়িয়ে পরে কনে পক্ষের আত্মীয়রা। এই পর্বকে বলা হয় 'জামাই ঘেরা'। জামাই ঘেরা আসলে শুভ কাজ করতে আসা জামাইয়ের কাছে মোটা টাকা আদায় করা। কনে পক্ষের সকল বয়সী আত্মীয়রাই এই 'জামাই ঘেরা' পর্বের অংশীদার হয় এবং তারা জামাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া টাকা নিজের মধ্যে ভাগ লড়ে নিত।
নিয়ম হল, জামাইকে গাড়ি বা ঘোড়া বা আগে ব্যবহার করা হত রিক্সা, তো সেই রিক্সা থেকে নামবেন কন্যার দাদু, দুলহা ভাই কিংবা অন্য কোনো পুরুষ আত্মীয়। যখন বরকে নামানো হয় গাড়ি থেকে ঠিক তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে কনের মহিলা আত্মীয়রা। আগে চল ছিল, এখম যদিও লুপ্ত প্রায়, বরের মুখের সামনে ধরা হত জ্বলন্ত একটি মশাল এবং তার পর মেহেন্দি পাতার লাঠি নিয়ে হালকা আঘাত করা হত বরকে এবং সেই সাথে গীত বড় আগমনী গীত গাইতেন মহিলারা। তবে সে গীত একটু অন্য ধরনের। অনেকটা মস্করা মূলক,
ব্যাটার মায়ের চোখটা আসমানের তারাটা
ধন্য লাগেরে ব্যাটার মাওখে দেখা
ব্যাটার মায়ের নাকটা হারমোনিয়ার বাঁশিটা
ধন্য লাগেরে ব্যাটার মাওখে দেখা
ব্যাটার মায়ের কানটা ত্যাল মাখার খুরিটা
ধন্য লাগেরে ব্যাটার মাওখে দেখা
ব্যাটার মায়ের পিটটা খার খাঁচার পিঁড়াটা
ধন্য লাগেরে ব্যাটার মাওখে দেখা
ব্যাটার মায়ের কোমরটা ধান কুটার ওখলিটা
ধন্য লাগেরে ব্যাটার মাওখে দেখা
ব্যাটার মায়ের পাওটা ধান কুটার সামাটটা
ধন্য লাগেরে ব্যাটার মাওখে দেখা
ব্যাটার মায়ের লাভিটা তারকারি খুলা বাটিটা
ধন্য লাগেরে ব্যাটার মাওখে দেখা...
নতুন পরিবেশে ব্যঙ্গধর্মী, মস্করা মূলক এই গীত শুনে পাত্র ধাতস্থ হয়। কারণ তাকে এই গিটগুলোর দ্বারা মনে করানো হয় যে পরিবেশ নতুন হলেও সে তাদেরই লোক। এর পর পাত্রকে নিয়ে যাওয়া হয় বসার ঘরে। কিন্তু বাঁধ সাথে সেখানেও। পাত্র যে ঘরে ঢুকবে সেই ঘর আটকানো আছে ফিতে দিয়ে। ফিতে কেটে তবেই ঢুকতে পাবে ঘরে। কিন্তু সেখানে দাঁড়িয়ে আছে কনের ছোট বোনেরা আর তার সেই ফিতেই আগে থেকে ঝুলিয়ে রেখেছে ফিতে কাটার মূল্য। পাত্র সেই মূল্যের টাকা দিলে তবেই ঢুকতে দেওয়া হবে ঘরে। নব্য শ্যালিকারা বড়ই নাছোড় বান্দা। পাওনা টাকা আদায় না করে ঢুকতে দেবে না ভাবি দুলহা ভাইকে। তাই অগত্যা এখানেও নব্য শ্যালিকাদের দাবী অনুযায়ী কিছু টাকা দিতে হয় বরকে। এর পর বর সেই বসার ঘরে ঢুকে গেলে বর ও তাঁর সাথে আসা পুরুষ বড় যাত্রীদের জল খাবার দেওয়া হয়।
![]() |
নবাগত বরকে জল খাবার দেয়ার আগে হবু শ্যালিকাদের একটুখানি মস্করা... |
মহিলা বর যাত্রী বা ডলি ওলিদের বসার জায়গা থাকে আলাদা। তারা গাড়ি থেকে নামলেই কনের মহিলা আত্মীয়রা মহিলা বর যাত্রীদের নল কূপের ধারে নিয়ে গিয়ে যত্ন করে মুখ হাত ধুঁয়ে নিয়ে ফ্রেশ হবার ব্যবস্থা করেন। প্রয়োজনে চিরুনি আয়না ও অন্যান্য প্রসাধনী সামগ্রীও কনের আত্মীয়দের তরফে পাত্র পক্ষের মহিলা আত্মীয়দের দেওয়া হয় যাতে করে বহু দূর থেকে আগত মহিলা বরযাত্রীরা নিজেদের ক্লান্তি ধুয়ে মুছে ফুরফুরে করে ফেলতে পারেন এবং এর পরই তাদেরও জল খাবার দেওয়া হয়।
খ. ভাজি ভাত খাওয়া- জল খাবার খাওয়া শেষ হয়ে গেলেই ডাক পড়ে ভাজি ভাত খেতে। ভাজি ভাত আসলে সবজি ভাতকে বলা হয়। সকাল বেলা আগত বর যাত্রীসহ গ্রামবাসীদের মরশুমী সবজির তরকারী দিয়ে ভাত খেতে দেওয়া হয় সকাল বেলায়। এখন অবশ্য এই সম্প্রদায়ের মানুষের হাতে টাকা এসেছে তাই সকাল বেলা ভাতের বদলে খেতে দেওয়া হয় লুচি তরকারি। খাওয়া শেষ হলে বিশ্রামের পালা আর দুপুরের বিয়ে পড়ানোর জন্য অপেক্ষা করা।
গ. বিহ্যা পড়ানো ও দুপুরের খাবার- জোহরের নামাজের পর বিয়ে পড়াতে আসেন পাত্রের সমাজের কিছু মানুষ, পাত্রীর সমাজের মানুষ, একজন কাজী যিনি বিয়ে নথিভুক্ত করবেন ও দুই পক্ষকের সাক্ষী। এই সময় পাত্র বসে থাকে তার বসার জায়গাতে এবং পাত্রী বসে থাকে অন্য একটি ঘরে। পাত্রের সামনে বিয়ের খুৎবা পড়া হয় এবং সর্বসমক্ষে পাত্রের বাড়ি থেকে আনা ডালা দেখানো হল। এর পর পাত্রের তরফে পাত্রীকে ইজাব অর্থাৎ বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো হয়। বিয়ের প্রস্তাব পাত্রীর কাছে নিয়ে যান পাত্র পক্ষের ও পাত্রী পক্ষের উকিল ও কিছু আত্মীয়। পাত্রীকে পাত্রের নাম ঠিকানা উল্লেখে করে পাত্রের তরফে মৌলানা সাহেব বিবাহের ইজাব বা প্রস্তাব দেন। কনে তিন বার কবুল বলে বিবাহের সেই প্রস্তাবে সম্মতি জানান এবং পাত্রীর কাছ থেকে জেনে নিয়ে গিয়ে পাত্রকেও ইজাব দেওয়া হয় পাত্রীর তরফে এবং সকলের উপস্থিতে পাত্র তিন কবুল বলে বিবাহে সম্মতি জানান। দুই জনের কবুল বলা হয়ে গেলে উপস্থিত বর যাত্রী ও আত্মীয়দের মোদহেবমিষ্টি মুখ করানোর জন্য লাড্ডু বা বাতাসা বিলিয়ে দেওয়া হয়। এর পরই কনের পিতা কিংবা সমস্থানীয় কোনো আত্মীয় পাত্রের সাথে আসা বর যাত্রীদের দুপুরের খাবারের জন্য আহ্বান জানান। জোলহা সম্প্রদায়ের মানুষ মূলত নিজেদের কাজের সুবিধার্থে বিবাহ করেন দিনের বেলায়। তবে প্রতিপত্তি শালী কেউ কেউ রাতেও বিবাহ করেন রীতিমত ধুমধাম করে।
বিয়ের পড়ানোর পর পরই পাত্রীকে সাজানো হয় নতুন শাড়িতে। সাজানো শেষে কনের আঁচলে দেয়া হয় এক অঞ্জলি বাতাসা। নিয়ম অনুযায়ী, সেই বাতাসা কনে তুলে দেয় মায়ের হাতে।
ঘ. সপাসপি- দুপুরের খাওয়া দাওয়া পর্ব শেষ হতে বিকেল ঘনিয়ে আসে। বিকেল হলেই বড় যাত্রীদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার ধুম পড়ে। কিন্তু তার আগেই কনে পক্ষকে সেরে নিতে হয় আরো দুই একটি লোকাচার। দুপুরের খাবার পর পাত্র ও তার সঙ্গীদের পান খেতে দেওয়া হয়। সব শেষে হলে এবার কনে পক্ষের তরফে কনের দুলহা ভাই বা বন্ধুরা পাত্রকে তাদের নিয়ে আসা কাপড় পড়ান।
এর পর কনে এবং পাত্রকে এক জায়গায় বসানো হয়। বেশ কিছুক্ষণ বসার পর কনে ও পাত্র নিজেদের মধ্যে মালা অদলবদল করে নেন। তারপর কনের দাদু বা সমবয়স্ক কেউ পাত্রীর হাত তুলে দেন পাত্রের হাতে। বলা ভালো, পাত্রীকে সপে দেন পাত্রের হাতে এবং এমত অবস্থায় পাত্রকে অনুরোধ করেন পাত্রীকে যেন সে স্বছল ও সুস্থ অবস্থায় রাখেন। এর পর সবার কাছ থেকে সালাম নিয়ে পাত্রীকে নিয়ে ও অপরিচিত পরিবেশ প্রথম বার গিয়ে যেন অসস্থিতে না পড়তে হয় তাই পাত্রীর সাথে পাত্রীর নানী বা দাদীকে নিয়ে বর যাত্রীরা রওনা দেন বাড়ি ফেরার পথে।
![]() |
| সপাসপির আগে বরের পাশে বসে থাকেন কনে... |
৩. বিবাহ পরবর্তী লোকাচার-
ক. বারহনতা- বিবাহ পরবর্তী এই দিনটিকে অবশ্য স্থানীয় ভাষায় বলা হয় বারহনতা। প্রচলিত ভাষায় যাকে বলে বউ ভাত। এ দিন উৎসবের সাজে থাকে পাত্রের বাড়ি। কনের জন্য শুরু হয় নতুন জায়গায় নতুন জীবন। তাই আর পাঁচটা দিনের মত সকাল বেলা উঠে আনমনে নিজের কাজ করার সুযোগ থাকে না মেয়ের। বরং প্রথম দিন থেকেই শুরু সাংসারিক যুদ্ধে টিকে থাকার জন্য হালকা প্রশিক্ষণ। নিয়ম হল, ঝাড় দিয়ে ঘর পরিষ্কার করে দিন শুরু করতে হবে কনেকে। ঘরের মধ্যে ফেলা হবে সুই-সুতো, ডাল, তামার পয়সা ইত্যাদি। সেগুলোকে আলাদা করে কুলোয় তুলে দিতে হবে শাশুড়িকে। এই প্রসঙ্গে Simone de Beauvoir এর একটি লাইন বেশ মনে পড়ছে। তিনি বলেছিলেন, "One is not born, but rather becomes, a woman." আর এই যে বিয়ের পর দিনই ঘর পরিষ্কার করা এই লোকাচার যেন নিজের জীবন নিজের মত বুঝে নেওয়া মেয়ে থেকে গার্হস্থ্য কর্মে নিপুনা (becomes, a woman) এক মহিলা তৈরি করার সুপরিকল্পিত সামাজিক ষড়যন্ত্র। এর পরই অবশ্য, নিয়ম মাফিক, মাছ কাটতে হয় কনেকে।
সকাল বেলা। বিয়ের পর প্রথম দিন। তাই মজার অবসর থাকে বেশি। কনেকে ও পাত্রকে রং মাখায় পাত্র পক্ষের আত্মীয় স্বজনেরা। রীতিমতো রং খেলার মহল তৈরি হয় পাত্রের বাড়িতে।
এর পর বাড়িতে আসবে গ্রামের ও কনের আত্মীয়রা। রীতিমত বউ ভাতের ভোজ অনুষ্ঠান জমে ওঠে তখন। বেলা পড়ে এলে পাত্র ও পাত্রী এক সাথে বসে এক জায়গায়। আগত অথিতি অথিতি তাদের উপহার বিনিময় করে। এরপর কনেকে পক্ষের আত্মীয়রা কনেকে নিয়ে কনের বাপের বাড়ি যায়। সাথে যায় পাত্র ও পাত্রের দুলহা ভাই। সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে পাত্রকে সঙ্গ দিতেই পাত্রের সঙ্গে যায় দুলহা ভাই।
খ. আরহনতা- উৎসব-অনুষ্ঠানের মেজাজ কিছুটা থিতিয়ে পড়লেও লোকাচারের কোনো শেষ নেই। লোকাচার চলতে প্রাত্যহিক জীবনে সমান্তরালে। অবশ্য বৈবাহিক বা বিবাহগত লোকাচার চলে প্রথম সন্তান লাভ অবধি। তারপর জীবনের নিয়মে স্বাভাবিক সংসারে ঢলে পড়লেই শিথিল হয়ে যায় বিবাহগত লোকাচার বা রীতিনীতি।
বারহনতার পরের দিনটি আরহনতা নামে পরিচিত। কনের সাথে পাত্রকে এই দিন থাকতে হয় কনের বাবার বাড়ির। নব্য জামাইয়ের প্রতি সম্মান জানাতে জলখাবারে কনের মা তৈরি করেন আনেসা, পুয়া ও ক্ষির। এই মিষ্টি জাতীয় খাবার খেয়েই শুরু হয় দিন। নিয়ম অনুযায়ী, বেলা গড়ালে কনের বাড়িতেও পাত্রকে নিয়ে রং খেলে কনের আত্মীয়রা। তারপর স্নান শেষে খেতে দেওয়া হয় পাত্রকে। পাত্রের জন্য এলাহী আয়োজন থাকে সেদিন। খাওয়া হলে হাত মুছিয়ে দেন দাদি বা নানী স্তরের কেউ। আর মুছিয়ে গাইতে থাকেন গীত তার চাইতে থাকেন হাত মুছিয়ে দেয়ার বকশিশ,
না লিব এক আন্নি না লিব দু আন্নি
লিব লিব গোটা রূপাইয়া রে কি
না লিব এক টাকিয়া না লিব দু টাকিয়া
লিব লিব গোটা পাঁচ শো টাকিয়া রে কি
না যদি থাকে তোর বহুকে বান্ধক রাখো
লিব লিব গোটা রূপাইয়া রে কি
এর পর পাত্র পক্ষের আত্মীয়রা এলে পাত্র ও পাত্রীকে নিয়ে যায় পাত্রের বাড়ি। সেখানে পাত্রীকে থাকতে হয় এক সপ্তাহ আট দিন মত।
সময়ের ঘষা লেগে ক্ষয়ে যাচ্ছে প্রাচীন এই সব গ্রামীন লোকাচারের শিলালিপি।
কৃতজ্ঞতা ও ঋণ স্বীকার
রৌশন আরা খাতুন, বয়স- ৫০, রন্নুচক
তথ্যসূত্র
Eaton, Richard. The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204-1760 (Volume 17) (Comparative Studies on Muslim Societies). Reprint, University of California Press, 1996.
Murshid, Ghulam. Hajar Bachorer Bangali Sanaskriti. Abashar, 2014.
Roy, Asim. The Islamic Syncretistic Tradition in Bengal. Princeton UP, 1984.
Chatterji, Joya. “The Bengali Muslim: A Contradiction in Terms? An Overview of the Debate on Bengali Muslim Identity.” Comparative Studies of South Asia, Africa and the Middle East, vol. 16, no. 2, Duke UP, Aug. 1996, pp. 16–24. https://doi.org/10.1215/1089201x-16-2-16.







Comments
Post a Comment