চুপ কথা

                                                                 চুপ কথা





সকাল আটটার বাসটা ধরব। বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি একা। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই এক চোখ কানা বাসটা এসে থামল স্টপেজে। উঠলাম তাতে। অফিস টাইমের প্রায় দুই ঘন্টা আগের বাস, প্রতিদিনের মতো আজও প্রায় ফাঁকা।

পরিচিত একজনের হাতছানিতে তার পাশের সিটে রাখা রুমাল তুলে বসলাম তাতে। কুশল বিনিময় ছাড়া অভ্যাস মত কথা বাড়ালাম না বেশি। সেও কি একটা বলার চেষ্টা করে থমকে গেল যেন।

গায়ে পড়ে জিজ্ঞাসা করা আমারও ধাতে সয় না। তাই তিনি কোথায় থাকেন, না থাকেন সে বিষয়ে কথা বাড়ায়নি কখনও। এমন কি জানতেই চাইনি, "আমার জন্য জায়গা রাখেন প্রতিদিন কেন?"

তবে তার বিচলিত মুখের ভাব লক্ষ্য করেছি প্রতিদিন। কোথা থেকে আসে জানি না। কোথায় যায় তাও জানতে চাইনি। তবে বুঝতে পারি, আমি তার পরে উঠি আর আগে নেমে পড়ি।

বছর শেষের শীতটা ক্রমশ জড়িয়ে ধরছে গায়ে। মাঙ্কি টুপি থেকে মোজা, কোনোটাই বাক্স ঠাসা হয়ে নেই। সবই শোভা পাচ্ছে গায়ে। আমি একটা কাশ্মীরি শালেই জড়িয়েছি নিজেকে। আমার পাশের যাত্রীটির সোয়েটারে আধুনিকতার ছোঁয়া। 

"আলম পুর, আলম পুর" ডাক খালাসীর গলায়। বাস থামতেই নেমে পড়লাম। কিন্তু জানালা দিয়ে লক্ষ্য করলাম আমার নতুন সহযাত্রীটির উদ্গ্রীবতা। আগে কোনো দিনও লক্ষ্য করিনি। অবশ্য ভাবিনিও যে আমার জন্য কাউরো উদগ্রীবতা থাকতে পারে।

নতুন কর্ম। নতুন কর্মক্ষেত্র। তাই চেষ্টা করি সবার আগেই এসে পৌঁছাতে। আবার ফিরেও যায়  নিয়ম মাফিক। দশটা-চারটার কর্ম গন্ডিতে নিজেকে বেঁধে রেখে ঘরে ফেরা পাখিদের অনুসরণ করতে থাকি বিকেলে। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। টেলিভিশনের রিমোট হাতে বদলাতে থাকি একটার পর একটা চ্যানেল। চোখ আটকে গেল একটি খবরের চ্যানেলে সম্প্রচারিত হওয়া খবরের পরিচিত বাসটিতে।

হ্যাঁ, পরিচতই তো, স্কুলে যোগ দেয়ার পর থেকেই ওই বাসের সাথে কেমন যেন সখ্যতা গড়ে উঠেছে আমার। বিশেষ করে যে দুটি সিটে নিয়মিত বসি আমরা, তাতে। খবরের শিরোনাম, "একটুর জন্যই চরম দূর্ঘটনা থেকে বাঁচল বাস।" 

আর আমিও বাঁচলাম হাফ ছেড়ে। কিন্তু বুঝতে পারছি না নিজের থেকেই কেন আমার চোখ খুঁজে নিতে চাইছে আমার সহযাত্রীটিকে। না, কোথাও পেলাম না। ফাঁকা পড়ে আছে সিট দুটি। পরিবর্তন করলাম চ্যানেলটি।

পরপর দুদিন আর স্কুল যাওয়া হয়ে উঠল না। শরীর সঙ্গ দিচ্ছিল না কোনো ভাবে। প্রথমে ভেবেছিলাম তেমন কিছু নয়, সামান্য পেট ব্যথা। পরে অবস্থা এমন দাঁড়াল, হসপিটালে থাকতে হল দুইদিন।

এ দুদিনে বাড়ি থেকে দেখার জন্য কেউ আসেনি। অবশ্য দেখতে আসার মত কেউ নেইও আমার।

আজ মাসের তিন তারিখ। পর পর দুদিন ছুটি থাকার পর বছরের প্রথম স্কুল আজ। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলাম না আর। শহরের কেন্দ্রীয় বাস স্ট্যান্ডের সামনে যেতেই পেয়ে গেলাম পরিচিত বাসটা। পুরো ফাঁকা।

বাসে উঠেই প্রথমে চোখে পড়ল জানালার পাশে ২৪, ২৫ নম্বর সিট দুটি। বসে পড়লাম একটাতে। আর পাশের সিটে রাখলাম আমার রুমাল। মানুষ তার জীবনে মাঝে মাঝে অনিশ্চয়তাকে নিশ্চিত ভেবে ভালোবাসে, ভুল করে। আমিও তেমনটাই করলাম, আমার সহযাত্রীটি আসবেন কিংবা আসবেন না অথবা কোথায় উঠবেন না জেনেই।

বাসের চাকা ততক্ষণে গড়াতে শুরু করেছে। বাস স্ট্যান্ড থেকে জাতীয় সড়কের কাছে পৌঁছতেই ধীরে করে থামল বাসটা। আর অমনিই পিছনের দরজা দিয়ে বাসে উঠে পড়েছেন আমার সহযাত্রীটি।

কিছু মানুষ আছে যাদের দেখলেই ঘর, ঘর মনে হয়। যাদের মধ্যে ঢোকা যায়, বেরোনো যায়, আবার চাইলেই থাকাও যায় বহু বছর। আমার সহযাত্রীটিও দেখতে  ঠিক তেমন ধরণের। কুশল বিনিময় শেষ করে রুমাল তুলে বসতে বসতে বললেন,

-এত সকালে মালদায়, কারণ কী? তার গলায় বিস্ময়ের সুর।

- না, তেমন কিছু না। এই এমনি। 

- এমনি মানে?

- ওই একটু হসপিটালে ছিলাম আরকি। আজ ফিরে যাচ্ছি।

হাসপাতাল থেকে ফিরছি শুনে সহযাত্রীটি আরো একটু বিস্মিত হলেন। নিজেকে সামলে নিয়ে জানতে চাইলেন, কেন, কী হয়েছিল আপনার?

- কিছু নয়, বলে সবিস্তারে বললাম আমার পার্থিব নরক বাস সম্পর্কে।

সব কিছু শুনে বললেন, এত কিছুর পরও একাই ফিরছেন, বাড়ি থেকে কেউ আসেনি?

জীবনের বহু প্রশ্ন আছে, যাদের উত্তর নিছকই নীরবতা। সেসবের উত্তর দিতে হয় না, বরং চুপ থাকতে হয়। তাই চুপ থাকলাম। কিন্তু চুপ থেকে কোনো লাভ হলো না। সহযাত্রীটি আবার জানতে চাইলেন, কী হল বললেন না যে, আপনার বাড়ি থেকে কেউ আসেনি সঙ্গে?

-না, কেউ আসেনি। আমি একাই ফিরছি।

-কেন?

-আসার মতো কেউ নেই বাড়িতে।

-মানে? আপনার বাবা-মা?

-তারা কেউ নেই পৃথিবীতে আর। আমি একাই থাকি। চলন্ত বাসের বাইরে জানালা দিয়ে তাকাতে তাকাতে বললাম।

-ক্ষমা করবেন। অযথা আপনাকে কষ্ট দিলাম। বলতে বলতে উদাসীন হয়ে গেলেন সহযাত্রীটি।

বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকলাম দুজনে। কোনো কোনো  নীরবতা এমন যা মানুষকে একে অপরের থেকে যতটা ই না দূরে করে তার থেকে বেশি একে অপরকে ততোটায় কাছে আসতেও সাহায্য করে। ক্রমশ মানুষ উঠতে শুরু করেছে বাসে। বাস শহর ছাড়িয়ে ছুটতে শুরু করেছে জাতীয় সড়কের উপর দিয়ে। 

আমার সহযাত্রীটির বয়স আন্দাজ পঁচিশ-চব্বিশ। সুশ্রী মুখমন্ডল। আধুনিকতা থেকে অনেক দূরে তার সাজ সজ্জা হলেও অনেকটা চোখে পড়ার মতো। আমি অবশ্য তাকাতে পারছিলাম না। বলা ভালো তাকাতে চাইছিলাম না প্রকৃতি রাজ্যের সৌন্দর্যময়তা ছেড়ে। কিন্তু যখন বুঝতে পারলাম আমার সহযাত্রীটি আমাকে কিছু বলতে চাইছেন তখনই তাকালাম তার দিকে। তাকাতেই চোখে পড়ল চোখ। এই সময়টাকে আমি এখন বলি শুভ দৃষ্টি।

চোখে চোখ পড়তেই তিনি বললেন, এখন কেমন আছেন?

-ভালো আছি। ও, হ্যাঁ বলতেই ভুলে গেছি, শুভ নববর্ষ।

- শুভ নববর্ষ, বলেই ব্যাগ খুলতে খুলতে আবার বললেন, "ধন্যবাদ মনে করিয়ে দেয়ার জন্য।"

-কী?

-এই যে শুভ নববর্ষ। কথা শেষ করেই, বলা নেই কওয়া নেই হাতে ধরিয়ে দিলেন রঙিন মোড়কে মোড়া চৌকমত নববর্ষের কোনো একটা সওগাত।

অপ্রত্যাশিত ঘটনা সামলে উঠতে মানুষের সময় লাগে। আমিও খানিকটা চিন্তায় পড়লাম। ভাবলাম এসবের আবার দরকার কী। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ফর্মালিটি বজায় রাখতে ব্যাগ থেকে আমার ছাত্রদের দেয়া দুটি কলম ধরিয়ে দিয়ে বললাম, আমার পক্ষ থেকে।

অসংখ্য ধন্যবাদ, বলেই আমার হাত থেকে নিলেন কলম দুটি।

নিঃসঙ্গতায় অভ্যস্ত মানুষ সঙ্গতার আভাস পেলে ভয় পায়। আমি অবশ্য তার সঙ্গতা নিয়ে ভয় পাচ্ছি না, বরং অবাক হচ্ছি তার দিন দিন ব্যাবহার দেখে। প্রথম প্রথম তার রুমাল তুলে বসতে অসুবিধা হত। তারপর এখন আবার নাম ধাম জানার আগেই উপহার বিনিময়। 

ইনটিউসন বিষয়টা বেশ ভালো। এই যে নাম ধাম জানার আগেই উপহার বিনিময় নিয়ে আমি ভাবছিলাম সে বিষয়ে হটাৎ কথা পাড়লেন তিনি, আচ্ছা লোক বলুন তো আপনি, এত দিন এক সাথে যাওয়া আসা করছি একসাথে অথচ না নাম বললেন, না নাম বলতে দিলেন।

-আরে হ্যাঁ, দুঃখিত। ক্ষমা করবেন, আসলে আপনি বুঝতেই পারছেন আমি নিজের মধ্যেই থাকি। তা সে যায় হোক, আমি পার্থ সারথি। আর আপনি? থতমত খেয়ে ঘেমে গিয়ে আমি বললাম।

-আমি পলাশপ্রিয়া। আমি একটি...

পলাশপ্রিয়াকে কথা শেষ করতে দিয়েই বললাম, বেশ সুন্দর নাম তো আপনার। 

প্রত্যুত্তরে পলাশপ্রিয়া কিছু বলবার আগেই বাসের খালাসির গলায় ডাক, "আলমপুর, আলমপুর।" নেমে পড়ার জন্য তৈরি হলাম। নেমেও পড়লাম তাড়াতাড়ি।

নামতে নামতে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের কাঁধ-মাথা-কানের ফাঁক দিয়ে আবার লক্ষ করলাম তার উদ্গ্রীবতা। 

হাঁটতে হাঁটতে, ভাবতে ভাবতে আর আদি বাসিন্দাদের আধুনিক জীবনের কার্যকলাপ দেখতে দেখতে বাস স্ট্যান্ড থেকে স্কুল আসলাম কোনো ক্রমে। স্কুল চলে এলেও কেন জানি না মন পড়ে আছে বাসেই।

টিফিনের ঘন্টা পড়তেই টিচার্স রুমে প্রবেশ করলাম আমি। একে একে প্রবেশ করছেন সহকর্মীরাও। ক্রমে জমে উঠছে বেয়াড়া তর্কের আসর। রাজনৈতিক ব্যক্তি-বক্তাদের মতোই উদ্দেশ্যহীন ভাবেই এর গায়ে হাসিঠাট্টার কাদা ছুড়ে দিচ্ছেন অন্যজন। আজ কেমন যেন ভালো লাগছে না। তাই ব্যাগ হাতড়ে বের করার চেষ্টা করি খবরের কাগজ।

কিন্তু একি! সহযাত্রী পলাশপ্রিয়ার দেওয়া মোড়কটি থেকে হাত নড়ছে না আমার। চোখও যেন নিস্পলক। আরো হয়তো কাটাতাম কিছুক্ষন ভাবে ভাবনায়। কিন্তু তা আর হলো না। আমার পাশের চেয়ারে বসে থাকা রণজিৎ বাবুর কথার চোটে ভেস্তে গেল সব।

তারপর আর দেখার চেষ্টা করিনি।  বাড়িতে এসে দেখলাম। দেখলাম মোড়কে মোড়া নতুন বছরের ডায়রী। প্রথম পাতাতে নাম ধাম লেখা। তার পরের কয়েক পাতা জুড়ে নববর্ষের কবিতা। বুঝলাম বেশ যত্ন করে সাজান হয়েছে ডায়রিটা।

আকস্মিক ভাবে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি অনেকটা চুম্বকের মতো। যে কাউকে আকৃষ্ট করতে ফেলে বেশ তাড়াতাড়িই। কাকতলীয় ভাবে ঘটা ঘটনা গুলো বুঝে ওঠার আগেই আমিও যেন সম্মোহিত হয়ে যাচ্ছিলাম।  মন্ত্রমুগ্ধের মতো ফোনটাও তুলে নিলাম হাতে পলাশপ্রিয়াকে ফোন করার জন্য। কিন্তু এ কি করা, ফোন নম্বর তো  নেওয়া হয়নি তার কাছ থেকে।

ডায়েরীর প্রতিটি পাতায় খুঁজলাম মন দিয়ে। পেলাম না। ব্যর্থতার বেদনায় খাবি খেতে খেতে মনকে সান্তনা দিলাম, কাল না হয় নিয়ে নেব।

বুকে পাওয়া না পাওয়ার নিদারুণ আকুতি। ঘুম আসছে না কোনো ভাবেই। জানলার ফাঁক দিকে এক ভাবে তাকিয়ে আছি চাঁদটার দিকে। যেন আমার দিকেই তাকিয়ে হাসছে সে, কিংবা হয়তো হাসছে আমার ভাগ্যের দিকে তাকিয়ে। জানি না।

কখন যে চোখ লেগেছিল মনে নেই। ঘুমটা ভাঙল কাকদের প্রভাত কালীন কাক-সভার ক্যাচক্যাচানিতে। শীত বেড়েছে ক্রমশ তবুও প্রতিদিনের অভ্যাসমত সকালের স্নান সেরে বসে পড়লাম সকালের প্রাতরাশে। কিন্তু বুকের ব্যাথাটা সারেনি এখনও। না, এ ব্যাথা সাধারণ নয়। অসাধারণ। অন্যরকম।

কোনো ভাবে তৈরি হয়ে পৌছালাম বাস স্ট্যান্ডে। বাস আসার সময় হয়েছে অথচ বাস আসেনি।

প্রেমে পড়ার একটি ভালো সাইড এফেক্ট হল সময় জ্ঞান হারানো। পলাশপ্রিয়ার সাথে দেখা হলে কি বলব না বলব সে কথা ভাবতে গিয়ে ভুলেই গেছি ঘড়ি দেখতে। ঘড়ি দেখে চমকে উঠি। প্রায় কুড়ি মিনিট পেরিয়ে গেছে অথচ বাসের পাত্তা নেই।

বেশি ক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। বাসটি এলো। বাসে চাপলাম। প্রয়োজনে পরিস্থিতিও মানুষের সাথে লুকোচুরি খেলে। মানুষকে ভয় দেখায়, শাসায়। বলে, তুমি তো আমার হাতের ক্রীড়নক হে বাছা। আমি যা করব তুমি তাই। সত্যিই আমি পরিস্থিতির শিকার। বাসে উঠেই চোখ পড়ল ২৪,২৫ নম্বর সিট দুটি। কিন্তু পলাশপ্রিয়া ছিল না সেখানে। অন্য কোথাও বসে থাকতে পারে ভেবে খুঁজলাম বাসময়। কিন্তু না পলাশপ্রিয়া নেই কোত্থাও।

ভীষণ একটা মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে পৌছালাম স্কুলে। স্কুলে এসেও মন টেকাতে পারলাম না ক্লাসে। অতি চেনা দেশগুলির রাজধানীর নাম গুলিয়ে ফেলছিলাম শুধু। খারাপ লাগছিল বেশ।

এই ভালো আর খারাপ লাগার মধ্যে খাবি খেতে খেতেই বিকেল চারটা অবধি কাটালাম স্কুলে। তারপর সারা জঙ্গল খুঁজে কিছু না পেয়ে ফিরে আসা ক্লান্ত-বিমর্ষ ব্যাধের মত বাড়ি ফিরে আসলাম আমি। বেশি কিছু করার ছিল না বলে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম বিছানায়। ক্লান্তিতে নিদ্রা দেবীর কোলে এলিয়ে দিলাম নিজেকে। অবশ্য অনিদ্রা দেবী নিদ্রা দেবীকে প্রতিহত করছিল বারবার। আর তাদের কাজিয়াতে ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল আমার। জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম সেই বোকা চাঁদটা। আমার দুর্ভাগ্যের আঁচ পেয়ে মরা বাড়িতেও হাসি হাসি মুখ নিয়ে যেন অট্টহাসির হাসি হাসছে সে।

সাজ সকালটাতে নিজেকে সাজালাম একটু। ভাবলাম, ভালো কিছুই হবে। কিন্তু কি জানি ভাগ্য যে কি চায়, ভালো কিছু হল না। বাসে উঠে দেখলাম পলাশপ্রিয়ার সিটটা খালি। ভাগ্যও মানুষের সাথে মাঝে মাঝে জুয়া খেলে। প্রথমে ছক্কা, তারপর আবার ছক্কা, তারপর ফক্কা, তারপর আবার ফক্কা, তারপর পুট। আমার ক্ষেত্রেও যেন তাই হচ্ছে। পরপর সাতদিন দেখা মিলল না পলাশপ্রিয়ার। বেশ আহত হলাম যাকে বলে। ভালো লাগছিল না কিছু।

মানুষ বরাবর ভুলতে ভালোবাসে। বিশেষ করে খারাপ স্মৃতি হলে তো কথাই নেই, নাওয়া খাওয়া ছেড়ে মানুষ খারাপ স্মৃতি ভোলার পেছনে লাগে। কিন্তু খারাপ স্মৃতি আবার ভীষণ খারাপ বিষয়। ভোলার যত চেষ্টা করা যায় ততই যেন  তাজা হয়ে ওঠে সেই স্মৃতি। আমারও অবস্থা তেমন হল। ভুলতে পারলাম না, বরং জড়িয়ে গেলাম পলাশপ্রিয়ার সাথে কাটানো নীরব সময় গুলোর সাথে।

যার জন্য সাজগোজের চেষ্টা তার দেখা না পাওয়ায়, সাজ গোজের সাধ মিটেছে গত সপ্তাহেই। আজ তাই সাজিনি তেমন ভাবে। কোনো মতে স্নান সেরে স্কুল যাওয়ার জন্য রওনা হয়েছি আজ। বাস এল  যথা সময়েই। বাসে উঠলাম। উঠেই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম ২৪, ২৫ নম্বর সিট দুটি। কিন্তু পারলাম না। ফাঁকা বাসটায় ভালোবাসার আবির ছড়িয়ে হাতছানি দিয়ে ডাকল পলাশপ্রিয়া, "পার্থ...।"

তাকাতেই দেখলাম পলাশপ্রিয়ার পাশে ফাঁকা সিটটার উপর রুমাল। আর পলাশপ্রিয়ার পরনে নতুন শাড়ি, হাতে শাখার মতো কী একটা সাদা চুড়ি। কিন্তু মাথায়? মাথায় মানে সিঁথিতে? সিঁথিতে কী ওটা? সিঁদুর!

প্রতিদিনের না পাওয়ার অভ্যাস বশত আজ পেয়েও ঘেমে গেলাম আমি। নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলাম না। টলতে টলতে পৌছালাম সিটটার কাছে।

বসলাম সিটটাতে। বসে তাকালাম পলাশপ্রিয়ার দিকে। দেখলাম তার হাসি মুখে হাসি নেই। বিয়ের চন্দন ফোঁটা গুলো বোধ হয় আজ সকালেই তুলেছে। হলুদ হলুদ মুখটাতে ফ্যাকাশে বিবর্ণতা।

ফ্লাশব্যাকের মতো ঠিক তখনই মনে পড়ল ডায়েরীর একটা পাতা। তাতে লাল কালিতে আঁকা ছিল ভালোবাসার প্রতীকী চিহ্ন অর্ধেক 'লাভ'। তারপাশে পলাশপ্রিয়া নামটির পাশে যোগ(+) চিহ্ন। তারপাশে ফাঁকা জায়গা। আর তার নিচে লেখা, "তোমায় ভালোবাসতে শুরু করেছি বেশ কিছু দিন থেকে। নীরবতাও যে ভালোবাসার জন্ম দিতে পারে জানতাম না। তোমার নীরবতা থেকেই যেন শিখেছি। যদি কোনো দিন তোমারও মনে হয় যে তুমি আমায় ভালোবাসো, এই পাতাটা পুরণ করে দেখাবে আমায়।"

ডায়েরীটা পাবার চারদিনের মাথায় অনেক সাহস করে পুরণ করেছিলাম পাতাটা। ভেবেছিলাম কাল দেখাব। কিন্তু কাল, কাল করতে করতে আজ যে এমন মহাকাল এসে পড়বে এটা ভাবতে পারিনি।

পলাশপ্রিয়ার মুখের দিকে তাকালাম একবার। চোখের কোনে দেখলাম জলের ঝিলিক। তার মুখে "ক্ষমা করবেন" শব্দ দুটিও শুনলাম। শুনতে শুনতে একবার ভাবলাম ডায়রীটা বের করে দেখায়। কিন্তু বের করলাম না। কারণ মনে হলো কোথাও যেন ভালোবাসার প্রতীকী চিহ্নটা আঁকতে গিয়ে হাতটা কেঁপে গেছিল আমার।



Comments

Popular posts from this blog

সামটাহা

The Little Prince

কালিয়াচকের জোলহা সম্প্রদায়ের বিবাহরীতি