আকমালের কবিতা: ইসলামিক মূল্যবোধের দিকে এক উদার যাত্রা
বয়স বাড়লে জীবন বিষয়ক মানুষের ধারণা বদলায়। বদলায় আত্ম যাপনের এক আপাত সংজ্ঞা। অনন্ত মহাজাগতিক কর্মকান্ডের ভিড়ে মানুষ নিতান্তই একা। তার বিবেকের কাছে কেউ যেন এসে ভীড় করতে পারে না। বরং তার বিবেক তরী এ ঘাট থেকে সে ঘাটে অভিজ্ঞতা ফেরি করে করে বেড়ায়। নিজের অভিজ্ঞতা ফেরি করার বিনিমিয়ে কুড়িয়ে নেয় অন্যের অভিজ্ঞতা এবং দেয়া নেয়ার এই পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়ায় সে নিজেকে সমৃদ্ধ করে। তৈরি করে বাঁচার জন্য এক নিজস্ব মূল্যবোধ। ধর্মীয় মূল্যবোধ বা মতবাদগত মূল্যবোধ মানুষের সেই নিজস্ব মূল্যবোধ তৈরিতে সাহায্য করে যা ব্যবহার করে মানুষ জীবনর পথে করে নেয় ঠিক, ভুলের বাদ বিচার। কবি মুহা আকমাল হোসেন একজন প্র্যাকটিসিং মুসলিম। আচার-আচরনে মুসলিম। আর তার সেই ইসলামিক মনোভাবাপন্ন মানসিকতা দারুণ ভাবে ফুটে ওঠে তার আধ্যাত্মিক কবিতা গুলোতে।
আত্মার কথা বলেছেন তিনি। বলেছেন আত্মকথা। বলেছেন আত্ম পরিশ্রুতকরণের কথা। আধ্যাত্মিকতার এক এবং একমাত্র সিদ্ধান্ত আত্ম-আত্মার আত্মীয় হওয়া। সেই আত্মীয় হওয়ার কথা ধর্ম যেমন ভাবে বলেছে, লোকায়ত জীবন দর্শনের পুরোধা, জ্ঞান তাপস লালন সাঁইও বলছেন অন্তরের আরশি নগরে বসবাসকারী পড়শীর সাথে যোগাযোগ রাখতে। ইসলাম ধর্মে একাত্ম হওয়ার নির্দেশ আছে পরম করুণাময় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রদর্শিত পথের সাথে। কারণ মহাপরাক্রমশালী আল্লাহই এক মাত্র সত্য। আর তাঁকে সত্য মেনেই ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ তাঁর দেখানো পথেই চালিত হন এক অনন্ত জীবনের উদ্দেশ্যে। কবির কথায় যে জীবনে পাওয়া যেতে পারে, 'পবিত্রতার ছিমছাম আতুরি খেলা'র স্বাদ। ২০১২ থেকে ২০১৭ অব্দি নতুন গতি পত্রিকার রমযান সংখ্যায় ধারাবাহিক ভাবে লিখছেন তাঁর খান তিরিশেকের মত আধ্যাত্মিক কবিতা। সাধারণ যাপিত জীবন যেমন তার কবিতার বাঁকে বাঁকে হটাৎ দাঁড়িয়ে পড়েছে ঠিক তেমনই তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক অনুশীলন প্রতিভাত হয়েছে স্বাভাবিক ভাবেই। ভাবনায় যেমন তিনি ক্লিয়ার, কবিতার ভাব প্রকাশ তেমনই নির্মেদ।
শব্দের পর শব্দ ঢেলে কবিতা বাঁধেন শব্দ কারিকর। আকমাল এ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র একজন তাঁত শিল্পী নন যিনি সুতার পরে সুতো দিয়ে একটি গামছা বুনছেন। বরং তিনি তাঁর দক্ষ শব্দ ব্যবহারে হয়ে ওঠেন একজন নিখুঁত ভাস্কর। কবি আকমালের মনে হচ্ছে এ শব্দটির ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। ব্যাস, আপন দক্ষতায় ছেনি(হাতুড়ি) ঠুকে ঝরিয়ে দিচ্ছেন অপ্রয়োজনীয় শব্দের মেদ বাহুল্য। আর তার পরিবর্তে ছেঁকে ছেঁকে বসিয়ে দিচ্ছেন যথা প্রয়োজনীয় শব্দরাজী। যেন এখানে এই শব্দটি বসলেই তৈরি হয়ে যাবে নিদারুণ এক কবিতা। অন্য শব্দটি ব্যবহার করলে নয়। 'নীলিমা' কবিতায় কবি আকমাল তাই তার পোষ্য শব্দ দিয়ে কবিতা লেখেন। সন্ধান দেন 'নেকীর খামার' এর। আর আল্লাহর উদ্দেশ্য নতজানু হন। 'আকাশ কেবলামুখী দিগন্তে সেজদা করা।'
ইসলামী আকিদার পাঁচটি মূল ভিত্তি কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ্জ্ব ও যাকাত। হজ্জ্ব ও যাকাত সামর্থবান
বিত্তশালীদের জন্য। কিন্তু বাকি তিনটি ভিত্তি হল সকল মুসলিম ব্যক্তির জন্য সমান
ভাবে ফরজ, অবশ্য
পালনীয়। কালেমা- শপথ বাক্যের মত বুকে গাঁথা এক আপ্ত বাক্য। আর এই আপ্ত বাক্য মুখে আউড়ে মনে প্রাণে
বিশ্বাস করাই একজন
মুসলিমের প্রথম পালনীয় কর্তব্য। তাকে স্বীকার করে নিতে হবে পরম প্রতিপালন কর্তা
নিরকার অস্তিত্বের কথা। তাঁর এক ও অদ্বিতীয় হওয়ার কথা। তিনি ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই আর
হজরত মুহাম্মদ (তাঁর উপর শান্তি বর্ষিত হোক) তাঁর প্রেরিত বার্তাবাহক। ইসলামিক দর্শন মতে পরম করুণাময় এই স্রষ্টার
সান্নিধ্য পাওয়া সম্ভব একমাত্র তাঁর ইবাদতের মাধ্যমে। তাঁকে রণে-বনে-জলে
স্থলে স্বরণ করে। ভালোবেসে শিরায় শিরায় তাঁর নামের স্লোগান তুলে। আর কবি আকমাল তার
কবিতায় ইসলামিক ভাবধারায় প্রাত্যহিক অনুশীলন ও
ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়ার কথা তুলে ধরেছেন। রমযানের তিরিশ দিন অন্যান্য মুমিন
ধর্মপ্রাণের মত দৈনন্দিন জীবনের 'পৃথিবীর সব গান মঞ্চস্থ' করা থেকে নিজেকে বিরত রাখেন। কারণ তিনি চান,
'চোখের ভিতর মেওয়া ফুলের মৌচাক
দান তর্জনী ডুবিয়ে ইফতারে চেখে দেখা যাক।'
পরম করুণাময় আমাদের আগলে রেখেছেন
পরম মমতায়। যেন তার মঙ্গলময় উপস্থিতি আমাদের চারদিক সামিয়ানার মত আমাদের ঘিরে
রেখেছেন। আগলে রেখেছেন দারুণ ভাবে।
প্রতিদিন অনন্ত সামিয়ানার চারদিক
তসবির গুঞ্জরণে সাজায় ঝালর
চাঁদের ঘ্রাণ মিলক্ জাফরান ঘিরে
অদৃশ্য ভিতরের কলরোল।
রমযানের মাস পবিত্র মাস। আত্ম
শুদ্ধিকরণের মাস। আত্ম সমীক্ষার মাস। সংযমের মাস। নিজের মধ্যে প্রবেশ করার মাস।
নিজের মধ্যে প্রবেশ করে নিজের আত্মার অন্দরের দরোয়াজা, জানালা ধুয়ে, মুছে, গুছিয়ে তকতকে করে রাখার মাস। যেন এই মাস জুড়ে রুহানি এক সময়ের ডাকে বিহ্ববল মুসলিম ধর্মালম্বী মানুষ জন। কবি
আকমালও যেন সাড়া দেন সেই ডাকে। অপ্রয়োজনীয় বিবাদ, বিষাদ ঝরিয়ে তিনিও যেন হয়ে উঠতে চান নবপল্লব ধারী
বটবৃক্ষ। সমৃদ্ধময় অন্তত পারের সেই স্বাদ অস্বাদনের জন্যই নব পল্লবধারী বটবৃক্ষ
হবার আগেই কবি হতে আগে বিশ্বাসের পথে পার্থিব ধুলো বালি ঝেড়ে নিঃস্ব হতে চান, ফতুর হতে চান। 'মোহ' কবিতায় তিনি তাই লিখছেন,
'নির্ঝরের মত ঝরি যতদূর ঝরা যায়
ভিতরের পাথর ভেঙে মুছি স্যাঁতলা
শ্যাওলা
হাত-পা মনের ইচ্ছে সব লুটিয়ে ফুটিয়ে
বিশ্বাসের পথে হব যে দেউলিয়া।'
'না' কবিতায় সিয়াম সাধনার এক অনবদ্য আত্ম ওপলব্ধির কথা তুলে ধরেছেন তিনি। বলছেন
শরীর যেন জেলখানা, নিজেকে
শিখিয়ে নেবার এক দারুন অনুশীলন কেন্দ্র, এক দারুন সংশোধনাগার। তিনি লিখেছেন,
'সিয়ামের ভিতরে একটানা
কেবলি না-না
তোমার ভিতরের জেলখানা'
গ্রামের মানুষ মহা. আকমাল হোসেন।
নাগরিক জীবনের ও প্রান্তেও যে আর এক ধারার জীবন আছে, যাপনের সেই একান্ত ধারা হেঁটে বেড়ায় আকমালের শব্দ সারণীতে। কখনো 'র'-এর ফোঁটায় বা কখনো আবেগ ঘনিষ্ঠ যতিচিহ্নে। শব্দে
শব্দে। বাক্যে বাক্যে। যেন পরিশ্রুতি করণের প্রয়োজন নেই কোনো। যেন overflow of powerful emotion। যেন কোনো কৃত্তিমতা নেই। নেই কোনো ছল চাতুরী, নাগরিক যাপন গাঁথার কোনো
উচ্চাভিলাষ। তাই তার কবিতায় গ্রামীন শব্দের যেন দারুন উৎসব, যেন গ্রামীন ভাবনার পলেস্তারা তার
কবিতাকে করেছে দারুণ ভাবে লোকায়ত। তিনি 'উল্লাস' কবিতায় লিখেছেন,
'আঙুলের করে করে চাঁদের বাড়া কমা।'
ঠিক এই রকমই তার গ্রামীন কণ্ঠে তিনি
উচ্চারণ করেন, 'ওযুর
বদনার নল মুখ তুলে দেখে চাঁদ'। 'আজ চাঁদ উঠবে' কবিতায় জেগে ওঠে বিষণ্ণ গ্রামীন
মুখ। তিনি লেখেন, 'বিষণ্ণ
আকাশের মুখে মেঘ/কঞ্চির আগার উৎসুক ফড়িংয়ের মত/আমারও ছিল ডানা।" যেহেতু
পত্রিকাটির রমযান সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল কবিতাগুলি তাই হয়ত রমযান মাস এবং রোজা
বিষয়ক কবিতা বেশি। সারা দিন পানাহার থেকে বিরত থাকার পরে গ্রাম বাংলার মুসলিম সমাজ
হাতে তুলে নেন দাঁতন। অনেক সময় সেই সব দাঁতন তৈরি হয় নিম গাছের ডাল থেকে।
স্বাভাবিক ভাবেই 'নিম
দাঁতন' কবিতায়
আকমালের কবিতায় ধরা দিয়েছে দাঁতন করার মুহূর্তের ছবি,
'উপোস দিনের আলো
দরিদ্র মুখের মত ঘ্রাণ
শুকনো বাঁশ পাতার মত ঠোঁট
নিয়মি বাতাসে উড়ে যায়...'
এছাড়াও 'তিরিশটি রাত', 'বলে দাও রোযা আছি', 'যদি বলি রোযা আছি', 'নিয়াত' কবিতায় রমজান মাসের নানান দিকের কথা। ইসলামে সন্যাস জীবনের
কথা উল্লেখ নেই। বরং ইসলাম বলে সাংসারিক হতে। আর এই সংসারিকতা ও সামাজিকতার মধ্যেই
পরম করুণাময়ের সকল নির্দেশাবলীকে সুষ্ঠ ভাবে মেনে মেনে চলতে। এমনই এক নির্দেশ হল 'ইত্তিকাফ' করা। রমযান মাসের শেষ দশ দিন দুনিয়াবী কর্মকান্ড থেকে
নিজেকে সরিয়ে রেখে আল্লাহর জিকির আসগারে মশগুল হওয়া। কবি আকমাল 'ইত্তিকাফ' কবিতায় তাই ইত্তিকাফের সংজ্ঞা
দিয়েছেন, 'মৃতের
মধ্যে রেখে দাও তোমার আমার ঠাঁই' আর '...
হাঁটো অতীন্দ্রিয় পথের পারে/ মনশূন্য থাকে তোমার আমার
সংসারে।' আর
এমনটা করলেই পাওয়া যাবে অনন্ত সেই পথের হদিশ,
'তোমার জন্য যখন ঠান্ডা হয়ে যাবে দোযক
তোমার সঙ্গে তখন আল্লাহর হয়ে যাবে আত্মিক যোগ।'
আরব মরুভূমির ধূধূ বালিয়াড়িতে জন্ম
ইসলাম ধর্মের তাই এই ধর্মের জীবন দর্শনকে ধারণ করে আছে আরব দেশীয় আরবি ভাষা। আরব
দেশের মূল ভুখন্ড থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের এই ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম
ধর্মীয় জীবন দর্শন যেমন অক্ষুন্ন আছে তেমনি এ দেশীয় শব্দের সাথে সংঘাতের পরও কিছু
শব্দ অক্ষয় হয়ে আছে। আর সেই সব আরবীয় শব্দের পাশে, আপন দক্ষতায়, দেশীয় শব্দ ব্যবহার করে দারুন শব্দ মালা তৈরি করেছেন
কবি আকমাল যা দারুণ
ভাবে উল্লেখনীয়। 'রমযানী
নীলিমা', 'আতুরি
খেলা', 'রহমতি
বার্তা', 'অনন্ত
সামিয়ানা', 'রাইয়ান
দ্বার', 'নেকীর
খামার', 'ফেরদৌসের
ঘর' ইত্যাদি।

Comments
Post a Comment