বোধের সকল স্তর ছুঁয়ে যায় কবি মুহা. আকমাল হোসেনের কবিতা
হাসান উজ জামান আনসারী
সহজ শব্দে বাঁচেন কবি মুহা. আকমাল হোসেন। গ্রামীন ইমেজ আর প্রান্তিক জীবন বোধের গাছ আঁকেন তিনি তার কবিতায়। সেই গাছ ডালপালা ছড়িয়ে ছায়া করে রাখে তার কবিতাকে। কবিতা লিখছেন তিন দশক ধরে। সময় আর আত্ম উপলব্ধির ঢেউ বারবার ভেঙে দিয়ে যায় তার নিজস্ব লেখার ছক। শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়ে থাকেন তিনি। প্রমিত বাংলা শব্দের পাশাপাশি স্থানীয় শব্দের সংমিশ্রণে এক নতুন শব্দলঙ্কার তৈরি করার দক্ষতাও অর্জন করেছেন তিনি। ফলে তার কবিতা খুব সহজেই ছুঁয়ে যায় বোধের সকল স্তর।
পেশায় শিক্ষক কবি আকমাল
ছাত্র পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকেই লিখে ফেলেন কবিতা। তারপর সেই কবিতা মনের মত হলেই পাঠিয়ে
দেন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায়। এপার বাংলা ও ওপার বাংলা মিলিয়ে প্রায় দুই
শতাধিক পত্রিকায় নিয়মিত ছাপা হয় তাঁর লেখা। তার লেখা কবিতা ছাপা হয়েছে ঐতিহ্যবাহী
সাহিত্য পত্রিকা দেশ-এও। সহজ কথা সহজ ভাবে বলা কঠিন। কবি আকমাল তাঁর কবিতা রচনার
মাধ্যমে সেই কঠিন কাজই করছেন নিরলস ভাবে। দেশ-কাল-রাজনীতির জটিল সমীকরণ সহজ অক্ষরে
তুলে রাখেন তিনি। আজীবনই মেহনতি মানুষের কাছাকাছি থেকেছেন কবি আকমাল। তাই
অবলীলাক্রমেই তাঁর কবিতায় ঠায় পায় মেহনতি জন জীবনের চালচিত্র। তাঁর কবিতা ও কাব্য
গ্রন্থ নিয়ে কলম ধরেছেন কবি তৈমুর খান, অধ্যাপক পুস্পজিত রায়, গল্পকার মহা.
জিকরাউল হক সহ অনেকে।
কবিতার পাশাপাশি
মধ্যবঙ্গের লোকজীবন ও লোক সাহিত্য-সাংস্কৃতি নিয়েও নিয়মিত কলম ধরেন তিনি। মালদহ
জেলার সুজাপুরে জন্ম তার। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর লেখায় স্থান পায় আম ও রেশম ব্যবসা
কেন্দ্রিক প্রান্তিক জীবন গাঁথা যা তথা কথিত প্রথম শ্রেণীর বাংলা সাহিত্যে বরাবর
দেখেছে বঞ্চনার মুখ। স্থানীয় ভাষা ও ঐতিহ্য নিয়েও বরাবরই আগ্রহ তাঁর। লোক জীবন
বিষয়ক গবেষণামূলক প্রবন্ধে গ্রামীন জীবনে ব্যবহৃত প্রবাদ-প্রবচনের তাত্ত্বিক ও
মনস্তাত্ত্বিক দিক যেমন উল্লেখ করেন তেমনি তিনি ভালোবাসেন কালিয়াচকের আঞ্চলিক ভাষায়ও
কবিতা লিখে ভাষাটির ধারাবাহিকতাকে অক্ষুন্ন রাখতে। সম্প্রতি কালিয়াচকের ভাষায় লেখা
একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পথে। পরীক্ষামূলক ভাবে আঞ্চলিক শব্দগুচ্ছের মধ্যে
আধুনিক ভাবদর্শন মিশিয়ে কালিয়াচকের ভাষায় কবিতা লিখছেন তিনি। নিঃসন্দেহে তার এই
কাব্যগ্রন্থ তার লেখা অন্য সকল কাব্য গ্রন্থের মতোই পাঠক মহলে সাড়া ফেলবে শীঘ্রই।
তার প্রকাশিত
কাব্যগ্রন্থগুলি হল বিস্রস্ত বাস্তবতা (২০০৮), প্রেম, প্রিয়াপুষ্প ও
পড়ন্ত বিকেল (২০১০), কমরেডের ডাইরি (বুদ্ধ পূর্নিমা-১৪১৮), মিনার হোসেনের ঘর
উঠোন (২০১২), ভাতের ঠিকানায়
কাঁদে ভারতবর্ষ (২০১২ ১০,জানুয়ারি), পৃথিবীর একলা কমন রুম (২০১৫)
ও ছেঁড়া কাফনের মেঘ (৭
ফেব্রুয়ারী ২০২১)। কবি হিসেবে আকমাল যেমন
সফল, সাহিত্য চর্চা
বিষয়ক উদ্যোক্তা হিসেবেও তিনি সমান ভাবে পরিচিত। নিজে যেমন কবিতা লেখেন তরুণ
প্রজন্মের কবিদেরও তেমন ভাবে শিখিয়ে দেব কবিতা চর্চার জটিল ব্যাকরণ। নিজস্ব কাব্য
গ্রন্থ প্রকাশের পাশে পাশি সংকলিত করেছেন একটি সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থও। গ্রন্থের
নাম গ্রাম মালদা কবিতা (২০১৩)। কবিতা চর্চার আঙিনায় যারা নতুন তাদের
স্থান দিয়েছেন তার এই কাব্যগ্রন্থে। নতুন কবিদের কবিতা চর্চায় উৎসাহ দেয়ার জন্য
শুধু কাব্য সংকলন নয় ১৯৯৯ থেকে 'যত্রিক' কবিতা পত্রিকা সম্পাদনা করেন। এছাড়া গৌড়বঙ্গ সাহিত্য
পত্রিকা' 'নয়া কাফেলা' পত্রিকার সহ
সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন। এহেন সাহিত্যিক কর্ম কাণ্ডের জন্য পেয়েছে একাধিক সাহিত্য
সম্মাননাও।

Comments
Post a Comment